Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

একাত্তরের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ‘আফটার শক’ সয়েছেন যাঁরা, তাঁদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বয়ান প্রামাণ্যকরণের উদ্দেশ্যে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলাম এ বছরের মধ্য এপ্রিলে। প্রথম পর্যায়ে ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন, সাংবাদিক আবেদ খান, শহিদ জায়া সালমা হকসহ বেশ কজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের সাক্ষাতকার ধারণ করি। পরে এ মিছিলে অংশ নিতে আহ্বান জানাই মুক্তিযোদ্ধা-জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, মুক্তিযোদ্ধা-সুরশিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা-চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দীন আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক ডা. এম এ হাসানসহ অনেককে। প্রায় সবাই সহযোগিতা করতে সম্মত হন। ফলে এ বিষয়ক গবেষণা ও প্রয়োজনীয় শুটিং সমান্তরালে এগোতে থাকে।

এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে গণহত্যার এসব ক্ষতচিহ্নের অস্তিত্ব খুঁজতে একটি শুটিং টিম নিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর হাজির হই খুলনার চুকনগরে। পাতখোলা বিল বিধৌত চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিসৌধে পৌঁছে গেটসংলগ্ন বাঁশের বেঞ্চে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী অশীতিপর বৃদ্ধ এরশাদ আলী মোড়ল ও স্মৃতিসৌধের সংরক্ষণকর্মী ফজলুর রহমান মোড়লকে পেলাম। কুশল বিনিময়ের পর তাঁরা পুরো এলাকা ঘুরে দেখালেন। একাত্তরের ২০ মে এখানে সংঘটিত গণহত্যা প্রসঙ্গে এরশাদ মোড়ল জানালেন, তাঁর বাবা চিকন আলী মোড়ল এ অঞ্চলের প্রথম শহিদ। বাবার লাশ শনাক্ত করতে এসে সেদিন তিনি অগণিত লাশের ভিড়ে খুঁজে পেয়েছিলেন ছয় মাসের অবুঝ এক কন্যাশিশুকে। এ শিশুটি তখন তার মৃত মায়ের দুধ পানের চেষ্টা করছিল। দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে উদ্ধার করে তিনি লালন-পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বললেন, ওই দিন শিশুটিকে কোলে নেওয়ার পর তিনি শিশুটির মার কপালে সিঁদুর ও হাতে শাঁখা দেখতে পেয়েছিলেন। তাই শিশুটিকে তিনি তাঁর নিজের কাছে না রেখে পরিচিত এক হিন্দু পরিবারে রেখে লালন-পালন করেছিলেন।

খুলনা থেকে চুকনগরে রওনা হওয়ার দিন স্থানীয় সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সেই কন্যাশিশুটিকে আমাদের সহযাত্রী করে দিয়েছিলেন। অন্যের ঘরে লালিত, শেকড়চ্যুত এই শিশুটি এখন ‘সুন্দরী বালা’ নামে পরিচিত। তাঁর কাছ থেকে শুনলাম, অসম বয়সী অসচ্ছল এক পাত্রের সঙ্গে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয়। দুটি ছেলেসন্তান রেখে স্বামী মারা গেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন তিনি ইটভাটায় দিনমজুরি করেন। পত্রিকায় তাঁর মানবেতর জীবনের কথা প্রকাশ পাওয়ায় নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকি তাঁকে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অস্থায়ী একটি চাকরির সুযোগ করে দেন। প্রশাসনের কাছ থেকে কিছু জমিও পেয়েছেন কিন্তু সেখানে বাড়ি করার মতো অবস্থা না থাকায় বর্তমানে তিনি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। আক্ষেপ করে বললেন, অর্থের অভাবে ছেলেদের লেখাপড়া করাতে পারেননি। তাঁর এক ছেলে দর্জি আর অন্যজন চুল কাটার কাজ করে। সুন্দরী বালাকে একাত্তরে যে স্থান থেকে উদ্ধার করেছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সেই স্থানে যাই। এরপর আনুষঙ্গিক দৃশ্য ও ইন্টারভিউ ধারণ করে চুকনগরে শুটিং শেষ করি।

সুন্দরী বালাকে তাঁর গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলি খুলনার কয়লাঘাটার দিকে। ওখানে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সমমনাদের নিয়ে কিছুদিন হলো গড়েছেন ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডে স্থাপিত এ জাদুঘরে একাত্তরের স্মারকের তেমন সমারোহ নেই। তবে যা আছে তা অনুভূতিকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জাদুঘরের নিচতলায় টিনশেডে ওঘরা যুদ্ধ স্মারক ‘বয়লার’টি এর যথার্থ প্রমাণ। বর্তমান সরকার এ প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি স্থায়ী বাড়ি দিয়েছে, কিন্তু সেটি জীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী ছিল। এই আর্কাইভ জাদুঘরের ট্রাস্টি স¤পাদক ডা. শেখ বাহারুল আলমের সঙ্গে খুলনার গণহত্যা ও আর্কাইভ-জাদুঘরের সার্বিক কর্মকা- নিয়ে কথা বলি। তিনি খুলনার গণহত্যা প্রসঙ্গে জানালেন, খুলনায় প্রথম শহিদ হন মহাদেব চক্রবর্তী। গণহত্যা ক্রমান্বয়ে খুলনার শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সবুর-ইউসুফ গংয়ের নেতৃত্বে ও প্রশ্রয়ে অবাঙালি বিহারি ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খালিশপুর শিল্প এলাকায় নির্মম গণহত্যা চালায়। বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এ শিল্প এলাকায় নারী ধর্ষণ ও গণহত্যার একজন জীবন্ত সাক্ষী।

খুলনায় ওই সময়ের নির্যাতিত নারীর মূর্তপ্রতীক হয়ে আছেন পাইকগাছা-কপিলমুনির গুরুদাসী ম-ল। তাঁর চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানদের একে একে হত্যা করা হয়। দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকেও নিষ্কৃতি দেয়নি ঘাতকরা। কোল থেকে কেড়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। গুরুদাসীকে ধরে নিয়ে যায় বটিয়াঘাটার বারআড়িয়া রাজাকার ক্যা¤েপ। সেখানে আটকে রেখে তাঁর ওপর চলে পৈশাচিক নিপীড়ন। চোখের সামনে প্রিয়জনদের বিভীষিকাময় মৃত্যু আর নিজের ওপর পাশবিক নির্যাতনে গুরুদাসী একসময় মানসিক ভারসাম্য হারান। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ এ খবর পেয়ে ঈদের দিন রাজাকার ক্যা¤পটি আক্রমণ করে। স্থানীয় মুজিববাহিনীর কমান্ডার বিনয় সরকারের নেতৃত্বে এই রাজাকার ক্যা¤প আক্রমণে সেদিন খুলনার দুজন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ বিসর্জন দেন। খুলনা সদর থানার ‘আজিজ-জ্যোতিষ’ সরণি আজ সে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সম্মুখযুদ্ধে ওই রাজাকার ক্যা¤েপর পতন হলে গুরুদাসী মুক্তি পান। কিন্তু স্বাধীন দেশে স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারেননি। একটা লাঠি হাতে তাঁকে প্রায়ই পাইকগাছা-কপিলমুনি সড়কে উন্মাদিনীর মতো ঘুরতে দেখা যেত। ২০০৮ সালে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

আর্কাইভ-জাদুঘরের ট্রাস্টি সদস্য সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী খুলনার গণহত্যার প্রেক্ষাপট স¤পর্কে জানালেন, যেহেতু খুলনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস অন্যান্য জেলার চেয়ে বেশি, সেহেতু গণহত্যার মাত্রাও সে রকম। গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘরের উদ্যোগে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় এ পর্যন্ত ২০০টি গণহত্যার স্থান চিহ্নিত হয়েছে। এসব স্থানে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে স্মৃতিফলক লাগানোর কথা বলেন আর্কাইভ-জাদুঘরের পরিচালক শহিদুল ইসলাম।

২৪ সেপ্টেম্বর সকালে আমরা খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে আড়ংঘাটার দিকে রওনা হই। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ডা. বাহার। আড়ংঘাটায় পৌঁছে আর্কাইভ-জাদুঘর স্থাপিত গণহত্যার স্মৃতিফলকটি অসমাপ্ত দেখলাম। ডা. বাহার জানালেন, এ স্মৃতিফলকের কাজ দ্রুত শেষ হবে। স্থানীয় স্বজন হারানো অশোক চট্টোপাধ্যায় ও অনিমেষ সরদারের সঙ্গে এলাকার গণহত্যা নিয়ে কথা হয়। অশোক একাত্তরে নবম শ্রেণিতে পড়তেন। পাকিস্তানি সেনারা তাঁর এ গাঁয়ে যেদিন হামলা চালিয়েছিল সেদিনের কথা বলতেই তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। তাঁর বাবা-জেঠা-জেঠাতো ভাইদের একই দিন হারিয়েছেন তিনি।

আড়ংঘাটা থেকে ফিরে পরদিন খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের বয়লারসংলগ্ন গণহত্যার স্মৃতিফলক দেখতে যাই। জুট মিলে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন দুপুরের কর্মবিরতি চলছিল। শ্রমিকরা দলবেঁধে বের হচ্ছিলেন। গণহত্যার স্মৃতিফলকের সামনে ক্যামেরা দেখে শ্রমিকদের অনেকেই উতসুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। বয়লারে নিক্ষিপ্ত শহিদদের কয়েকজনের নাম ও এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস স্মৃতিফলকে লেখা আছে।

একাত্তরে খুলনার এই মিলের যে বয়লারে মানুষকে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়েছিল, আর্কাইভ-জাদুঘরের উদ্যোগে সেই বয়লারের পুরনো অংশবিশেষ বর্তমানে জাদুঘরের নিচতলায় সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে। একাত্তরে নাৎসি কায়দায় বাঙালিদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন এটি।

ইমন শিকদার

কালের কণ্ঠ, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

Post a comment