গণহত্যার ইংরেজি করতে গিয়ে আমরা সাধারণত ’জেনোসাইড’ (Genocide) বা ’ম্যাস কিলিং’ (Mass Killing) শব্দযুগল ব্যবহার করি। কিন্তু, শব্দদু’টির মধ্যে একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হলো ’ম্যাস কিলিং’ বা ’ম্যাস মার্ডার’। আর বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞকে বলে ’জেনোসাইড’। Genocide (জেনোসাইড) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ’ Genose’ (অর্থ জাতি, মানুষ) আর ল্যাটিন শব্দ ’Cidere’ (অর্থ: হত্যা করা) থেকে। ’জেনোসাইড’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন পোলিশ আইনজ্ঞ রাফায়েল লেমকিন।

অপরাধ হিসেবে গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের The Convention on the Prevention and Punishment of the Crimes of Genocide বা জেনোসাইড কনভেনশনে। ওই সংজ্ঞায় গণহত্যার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে এর যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হলো:

কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া।

এর একটি বৈশিষ্ট্য থাকলেই সেটিকে গণহত্যা বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে চালানো গণহত্যায় উপরের পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রথম চারটিই সংঘটিত হয়েছে।

গণহত্যা এতোই মারাত্মক যে আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি বা কূটনীতির উৎস জাতিসংঘের ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা কনভেনশন। সেখানেও গণহত্যাকে জুস কজেনস্ (Jus Cogense) বা সর্বমান্য আইনের আওতায় ফেলা হয়েছে। এই ’জুস কজেনস’- এর বিধান অনুযায়ী, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধের মতো অপরাধ কোন রাষ্ট্র বা সরকার ক্ষমা করতে পারবে না, এমনকি কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও এই অপরাধের ক্ষমা নেই।

এতো কিছুর পরেও বাংলাদেশ এখনো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থ হয়নি, উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলেছে, শহিদ ও নির্যাতিতের সংখ্যা নিয়ে চলছে দেশী-বিদেশী অপপ্রচার।  এর পেছনে বহুমুখী কারণ থাকলেও মূল কারণ হলো: গণহত্যা ও নির্যাতনকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়াটা মানসিকতা। অথচ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্যই গণহত্যা ও নির্যাতন। এর কারণ ছোটবেলা থেকেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা ও বিজয়গাঁথাই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়েছে, গণহত্যা ও নির্যাতনের কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র, সাহিত্য, আলোচনা ও স্মৃতিচারণেও এই বিজয়গাঁথার জয়জয়কার। বিজয়ী হওয়ার পর মানুষ সাধারণত বিজয়কে ভুলে যায়, কিন্তু গণহত্যা-নির্যাতনের মতো শোক, কষ্ট আর অপমানকে সারাজীবন মনে রাখে। মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন হারিয়েছে সেইসব শহিদ পরিবারের কাছে যান, নির্যাতিতা নারীর কাছে যান, ঐ সময়ে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া শরণার্থীদের কাছে যান, সেইসব দগদগে কষ্টের একটি স্মৃতিও তারা ভোলেনি, কোনদিন তারা সেটা ভুলতে পারবেনও না। অথচ, গণহত্যা ও নির্যাতনটিই সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া দরকার ছিলো। সারা পৃথিবীতে সেটাই করা হয়। ছোট একটা উদাহরণেই সেটা স্পষ্ট হবে, আমাদের গণহত্যা নিয়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অন্তত সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হলেও, বাংলাদেশে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি পড়ানো হয়।

মূলত এসব বিষয় অনুধাবণ করেই দক্ষিণের জেলাশহর খুলনায় গড়ে উঠেছে ’১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর ও আর্কাইভ। গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বের কাছে আমাদের গণহত্যাকে ছড়িয়ে দিতে গণহত্যা জাদুঘর যেসব কার্যক্রম চালাচ্ছে সেগুলো হলো:

১) মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা-নির্যাতন, বধ্যভূমি, গণকবর সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ তৈরি ও সংরক্ষণ

২) মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা-নির্যাতনের ছবি, স্মৃতি, স্মারক জাদুঘরের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে এবং ভার্চুয়ালি প্রদর্শন

৩) দেশজুড়ে গণকবর ও বধ্যভূমি সংরক্ষণে সেগুলি চিহ্নিত করা ও স্থায়ী স্মৃতিফলক লাগানো

৪) গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, সভা-সেমিনার, স্মারক বক্তৃতা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা

৫) বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ গণহত্যা কোষ তৈরি

৬) স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গণহত্যা-নির্যাতনের গল্প বলা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ত করা

৭) গণহত্যা-নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী বা ভুক্তভোগীদের সাক্ষাতকারগ্রহণ এবং অডিও-ভিজুয়্যাল আর্কাইভ তৈরি

৮) বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও চর্চা কেন্দ্র তৈরি

৯) বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বৈশ্বিক প্রচারণা, নেটওয়াকিং ও অ্যাডভোকেসি করা

১০) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রকাশনা

’১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ শুধু বাংলাদেশেরই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনা শহরের একটি ভাড়া বাড়ীতে এই জাদুঘর ও আর্কাইভের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই জাদুঘরকে জমি এবং বাড়ী উপহার দেন এবং সেটিকে সংস্কার করে খুলনার ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডের নিজস্ব ভবনে গণহত্যা জাদুঘর নতুন করে যাত্রা শুরু করে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন।

বাংলাদেশের এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি খুলনায় স্থাপন করার পেছনে প্রধান দু’টি কারণ হলো: চুকনগর গণহত্যাকে বিশ্ববাসীর নজরে আনা এবং মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণ।

© Genocide Museum Bd | All Rights Reserved | Developed by M Dot Media