Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

খুলনার ১৭ গণহত্যার স্মৃতি

Dr. Chowdhury Shahid Kader

মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পর আমরা আমাদের বিজয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, গণহত্যা ও নির্যাতনকে নয়। বিজয়ী হওয়ার পর মানুষ সাধারণত বিজয়কে ভুলে যায়, কিন্তু গণহত্যা-নির্যাতনের মতো শোক আর অপমানকে সারা জীবন মনে রাখে। কিন্তু আমাদের এখানে বিজয়ের গল্পে বিস্মৃত হয়েছে আত্মত্যাগের ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন একটি দেশে এত অল্প সময়ে এত হত্যা হয়নি যা হয়েছে বাংলাদেশে। যদিও আমরা বলি ৩০ লাখ শহীদ হয়েছেন কিন্তু মনে হয় সংখ্যাটি তারও বেশি হবে। গণহত্যা, বধ্যভূমি, নির্যাতন মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে একেবারে নেই, তা নয় কিন্তু গুরুত্ব ততটা এর ওপর দেয়া হয়নি। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের ব্যাপারটি আড়ালে পড়ে যায়। কিন্তু ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা হয়েছিল তার ওপরই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, শিল্পকলা সব ক্ষেত্রে এখনও সেই গণহত্যা-নির্যাতনের কথা ফিরে আসে। যে কারণে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ আর নাজিবাদ জায়গা করে নিতে পারেনি। আমাদের এখানে তা হয়নি দেখে গণহত্যার সংখ্যা নিয়ে এখনও অনেকে প্রশ্ন করার সাহস রাখেন এবং হত্যাকারীদের সমাজ ও রাজনীতিতে এমনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে তারা একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের আত্মত্যাগের সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় খুলনায় গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গণহত্যা জাদুঘর। গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণে এই জাদুঘর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরতে স্মৃতিফলক নির্মাণ।

দেশের নানাপ্রান্তে গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্মৃতিফলক নির্মাণের কাজ চলছে। এই নিবন্ধে সংক্ষিপ্তাকারে খুলনায় স্থাপিত ১৭টি স্মৃতিফলকের পরিচয় তুলে ধরলাম।

১. খুলনা শহরে প্রথম গণহত্যা সাউথ সেন্ট্রাল রোডের স্মৃতিফলক

খুলনা শহরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রথম গণহত্যার শিকার হন মহাদেব চক্রবর্তী। একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সাউথ সেন্ট্রাল রোডে মহাদেব চক্রবর্তীসহ ৫/৬ জনকে হত্যা করা হয়। এটাই খুলনা শহরের প্রথম গণহত্যা। অকৃতদার মহাদেব বাবুর দ্বিতল বাড়িতে দেশ স্বাধীনের পর সরকারী পাইওনিয়ার কলেজটি স্থাপন করা হয়। পাইওনিয়ার কলেজ পরবর্তীতে সরকারী করা হয়। পাইওনিয়ার কলেজ যে মহাদেব চক্রবর্তীর বাড়িতে স্থাপিত এবং তিনি খুলনা শহরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রথম গণহত্যার শিকার তা দীর্ঘদিন খুলনাবাসীর নিকট অজানা ছিল।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ গণহত্যা জাদুঘর এখানে দুইটি ফলক স্থাপন করে। একটি কলেজের ভেতরে। অপরটি স্থাপন করা হয় কলেজের গেটে। এর ফলে কলেজের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের জানার সুযোগ হয় খুলনার প্রথম গণহত্যা ও মহাদেব বাবুর বাড়ির বিষয়ে।

২. হ্যানে রেলওয়ে পাবলিক স্কুল বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক স্থাপন

মুক্তিযুদ্ধকালে শতাধিক শহীদের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি এটি। বিহারিরা স্থানীয় বিপুলসংখ্যক বাঙালীকে এখানে এনে হত্যা করেছেন। হ্যানে রেলওয়ে পাবলিক স্কুলের প্রায় বিস্মৃত গণহত্যার স্থানটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় গণহত্যা জাদুঘর। স্কুল প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিফলক।

৩. চরেরহাট গণহত্যা

চরেরহাট মাছ কোম্পানির পূর্ব পাশে নদীর কূলে ছিল মাছ কোম্পানির জেটি। এই জেটিতে ১৯৭১ সালে জাহাজ লাগিয়ে মাছ রফতানি করা হতো। ১৯৭১ সালের ৮ মে যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার রঘুনাথপুর থেকে সকাল ৮টায় ২টা লঞ্চ খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বেলা ১১টার দিকে চরেরহাটের কাছাকাছি পৌঁছায়। তখন খান সেনারা ২টি গানবোটে দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে আসে এবং সারেংকে লঞ্চটি মাছ কোম্পানির জেটিতে লাগাতে হুকুম করে। এরপর সকল যাত্রীকে নামিয়ে তিন শ’র অধিক পুরুষকে তিন ভাগে ভাগ করে মাছ কোম্পানির পূর্ব পাশের দেয়ালের কাছে, খালিশপুর হাইস্কুলের পাশে এবং রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে, বিকেলে স্থানীয় লোকজন মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দেয়।

এই স্থানটির গণহত্যার বিষয়টি স্থানীয় লোকজন ভুলতে বসেছিল। গণহত্যা জাদুঘর স্থানটি চিহ্নিত করে ৩১ অক্টোবর ২০১৫ খালিশপুরের চরেরহাটের পুরাতন মাছ কোম্পানির পশ্চিম পাশে দেয়াল ও রাস্তাসংলগ্ন স্থানে একটি ফলক স্থাপন করে।

৪. বাদামতলা বধ্যভূমি

খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলায় অবস্থিত বাদামতলা বধ্যভূমি। একাত্তরে সবুর খানের নেতৃত্বে এখানে গণহত্যা চালানো হয়। বাদামতলা বাজারে আগে থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী জড়ো হয়েছিল সীমান্ত পাড়ি দিতে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁদের বাদামতলা বাজারের অদূরে জড়ো করে গুলি চালাতে থাকে, শরণার্থীরাও যেদিকে পারে পালাতে থাকে। ১০০-এর অধিক লোক নিহত হয়, যাদের অনেকেরই পরিচয় পাওয়া যায়নি। বাদামতলা গণহত্যা থেকে যারা বেঁচে যায় তারাই আবার ২০ মে চুকনগর গণহত্যার শিকার হয়।

৫. সাচিয়াদহ গণহত্যা

খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার আঠারবাকি নদীর তীরবর্তী গ্রাম সাচিয়াদহ। গ্রামের নদীপারের বাজারটির নাম সাচিয়াদহ বাজার। ১৯৭১ সালের ১৪ মে পাকিস্তানী সেনারা এই গ্রাম ও বাজারে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে এবং লুটপাট করে। পাকিস্তানী সেনাদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে সেদিন ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।

১৯৭১ সালে সাচিয়াদহ বাজার ও তার পাশের গ্রামে পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ও তাদের এ দেশের দোসরদের সাহায্যে যে গণহত্যা চালানো হয় তা তেরখাদাসহ খুলনার সর্বস্তরের লোকজন ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলে যাওয়া ঘটনা আবার মনে করিয়ে দেয়ার কাজটি করেছে খুলনার গণহত্যা জাদুঘর। ২৬ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে সাচিয়াদহ গণহত্যার স্থান চিহ্নিতকরণ ও স্মৃতিফলকটি উন্মোচন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ নাসির উদ্দিন আহমেদ।

৬. আজগড়া গণহত্যা

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল খুলনা জেলার অন্তর্গত তেরখাদা থানার আজগড়া গ্রামে এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চলে। স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য জুম্মান খানের সহযোগিতায় খুলনা থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর একটি দল এদিন আজগড়া গ্রামে প্রবেশ করে ৪০ জনের অধিক ব্যক্তিকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। তাঁদের স্মৃতিতে এখানে স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন গণহত্যা জাদুঘরের স্বপ্নদ্রষ্টা মুনতাসীর মামুন।

৭. আন্দুলিয়া মসজিদ গণহত্যা

১৯৭১ সালে শবে বরাতের দিনে [মে মাসে] এই মসজিদের পাশের রাস্তায় পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের বহনকারী একটি গাড়ি কাদায় আটকে যায়। রাজাকাররা মসজিদ থেকে ও বাড়ি থেকে জোর করে মুসল্লিদের এনে কাদা থেকে গাড়িটি তোলার ব্যবস্থা করে। এরপর তাঁদের মসজিদ ও এই রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। আনুমানিক ১০ জন শহীদ হন। তাদের স্মৃতিতে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়।

৮. পিপরাইল চারাবাড়ী ঘাট বধ্যভূমি

পিপরাইল চারাবাড়ী ঘাট বধ্যভূমিটি ফুলতলা উপজেলার ৩নং জামিরা ইউনিয়নে পিপরাইল গ্রামে অবস্থিত। যুদ্ধকালীন জামিরা বাজারে ছিল রাজাকার ক্যাম্প। এ বাজার থেকে সামান্য দূরে পিপরাইল খালের তীরে চারাবাড়ী ঘাট অবস্থিত। ১৯৭১ সালে এই স্থানটি একটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। রাজাকাররা ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক ধরে এখানে এনে হত্যা করে খালের পানিতে ফেলে দিত। এসব হতভাগ্যের মধ্যে পিপরাইল গ্রামের ছয়জন, ছাতিয়ানী গ্রামের সাতজন, ডাউকোনা গ্রামের দুইজন এবং কাটেঙ্গা গ্রামের পাঁচজনের পরিচয় জানা যায়। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজাকাররা এ ঘাটে তিন শতকের অধিক লোককে হত্যা করলেও এর পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যান তৈরি করা সম্ভব নয়।

৯. আড়ংঘাটা গণহত্যা

১৯ এপ্রিল খুলনা জেলা রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার শেখ মনিরুল ইসলাম ওরফে মনু শেখ কয়েক গাড়ি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও রাজাকার নিয়ে এ গ্রামের ওপর হামলা চালায়। এখানে ৭ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন জাদুঘরের সহসভাপতি শিল্পী হাশেম খান।

১০. নসুখানের ইটেরভাঁটি গণহত্যা

বর্তমান খানজাহান আলী মেট্রো থানার অন্তর্গত মিরেরডাঙ্গা আর আর এফ কোর্য়ার্টারের ও বর্তমান খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারটিতে (যশোর-খুলনা সড়কের পাশে) নসুখানের ইটেরভাঁটি অবস্থিত ছিল। এখানে পাকিস্তানী সেনাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত হত্যাকা- সংঘটিত হয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক গণহত্যা সংঘটিত হয় মে মাসের ২৯ তারিখে। এই দিন শতাধিক লোককে এখানে হত্যা করা হয়। ভারতে সীমান্ত পাড়ি দিতে জড়ো হওয়া শতাধিক এই শহীদের স্মরণে এখানে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।

১১. দৌলতপুর গণহত্যা

১৯৭১ সালে ২৩ মার্চ সকাল ১১টায় যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী খুলনায় যাওয়ার পথে গণমিছিলে গুলি করে ৯ জনকে হত্যা করে। তাদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।

১২. নিউজপ্রিন্ট মিল গণহত্যা-গণকবর

২৭ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী খুলনায় যাওয়ার পথে নিউজপ্রিন্ট মিলের সামনে বাধাপ্রাপ্ত হয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গুলিতে মিলের সুপারভাইজার আলম শহীদ হন। তারা এখানে একটি ঘাঁটি স্থাপন করে। বিহারী শ্রমিক-কর্মচারীরা পাকিস্তানী সেনাদের সাহায্য নিয়ে ৯ মাসব্যাপী এই মিলে অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটায়। এখানে একদিনে ১০০ এর অধিক শ্রমিক-কর্মচারী পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে নিহত হয়। এই মিলে ১০০০-এর অধিক শ্রমিক-কর্মচারী পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে নিহত হয়। নিউজপ্রিন্ট মিলের কলোনিতে একটি গণকবর যাদের হাড়গোড় পাওয়া গেছে, সেখানে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।

১৩. প্লাটিনাম জুবলি জুটমিল গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জুটমিলের ৬০ জনের অধিক বাঙালী শ্রমিককে বস্তাবন্দী করে জ্বলন্ত বয়লারে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। প্লাটিনাম জুবলি জুটমিলের বিহারী শ্রমিক-কর্মচারীরা পাকিস্তানী সেনাদের সাহায্য নিয়ে ৯ মাসব্যাপী এই হত্যাকা- ঘটায়। শ্রমিকদের প্রথমে বস্তাবন্দী করা হতো। এরপর বয়লারের সামনের পাকা গাঁথুনির ওপর বসিয়ে রাখা হতো। তারপর এক একজনকে নিয়ে প্রথমে পা তারপর শরীর এবং শেষে মাথা জ্বলন্ত বয়লারে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো।

একাত্তরে এই মিল এলাকায় ৭০০-এর অধিক বাঙালীকে হত্যা করা হয়।

১৪. মুন্সিবাড়ি গণকবর চিহ্নিত এবং স্মৃতিফলক স্থাপন

৭ এপ্রিল ১৯৭১ বিকেল ৩টায় খালিশপুর নয়াবাটির (মুন্সিবাড়ি) মুন্সি সিদ্দিকুর রহমানের বাড়িতে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী ও বিহারীরা ১৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।

১৫. গল্লামারী বেতার ভবন নির্যাতন কেন্দ্র

একাত্তরের নির্মমতার সাক্ষী গল্লামারী বধ্যভূমির স্থানটিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে এই জায়গাটিতে ছিল ধানক্ষেত ও জলাভূমির মাঝে একটি একতলা অবকাঠামো। যেখান থেকে বেতার কার্যক্রম সম্প্রচার হতো। শহর থেকে দূরে এই গল্লামারী জায়গাটি ছিল বেশ নির্জন। বেতারকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের নামে পাকিস্তানী সেনারা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই এই ভবনটি দখল করে নেয়, আর মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এই ভবনে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। দেশ স্বাধীনের পর এই এলাকায় পাওয়া গেছে হাজার হাজার নরকঙ্কাল। এই নির্মম নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করে বধ্যভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের প্রবেশ পথের পাশে সীমানা প্রাচীরের বাইরে গল্লামারী বধ্যভূমি ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়।

১৬. ভূতের বাড়ি নির্যাতন কেন্দ্র

মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাদের সহায়তার জন্য জামায়াতে ইসলামী নেতা একেএম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে এই বাড়িতে ৯৬ জামায়াত যুব ক্যাডার নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলে। রাজাকার নামটিও তার দেয়া। এটাই একাত্তরের প্রথম রাজাকার ক্যাম্প। এই রাজাকারই মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীকে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধ করে।

১৭. খুলনা হেলিপোর্টের নির্যাতন কেন্দ্র

খুলনা সার্কিট হাউসের বর্তমান নতুন ভবনের স্থানে ১৯৭১ সালে টিনের আটচালা ছাউনির ঘর ছিল, যা হেলিকপ্টারের যাত্রীদের বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সার্কিট হাউসের পুরাতন ভবন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের অফিস হিসেবে ব্যবহার করত এবং বিশ্রামাগার ব্যবহৃত হতো নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে। এখানে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের এনে জিজ্ঞাসাবাদের নামে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। এখানে প্রতিদিন শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হতো। বিশ্রামাগার ভেঙ্গে খুলনা সার্কিট হাউসের নতুন ভবন গড়ে তোলায় ঘটনাটি একেবারে আড়ালে চলে যায়। গণহত্যা জাদুঘর স্মৃতিফলক লাগিয়ে বিস্মৃত সে ইতিহাসকে লোকচক্ষুর সামনে আনেন।

একাত্তরের গণহত্যার শোকাবহ ইতিহাস আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গণহত্যা জাদুঘর নানা প্ল্যাটফর্মে কাজ করছে। স্মৃতিফলক নির্মাণের মাধ্যমে মূলত প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে বিস্মৃত গণহত্যা-নির্যাতনের ইতিহাস প্রতিষ্ঠাই এর প্রাথমিক লক্ষ্য। পাশাপাশি এসব বধ্যভূমি-গণহত্যা নিয়ে গ্রন্থ রচনা, জিপিএস ট্র্যাকিং, ইন্টারনেট কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। চেষ্টা করা হচ্ছে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে প্রায় হারিয়ে যাওয়া গণহত্যা-নির্যাতনের ইতিহাস বিনির্মাণের।

লেখক : ট্রাস্টি, গণহত্যা জাদুঘর, খুলনা

https://goo.gl/8vH4t4 

Post a comment