Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

একাত্তরের দেখা মেলে


‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। তাতে আছে বাঙালির মুক্তি, স্বাধীনতার স্পৃহা ও মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক অনেক নিদর্শন। প্রতিটির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের চোখে ভাসে বাংলাদেশের জন্মমুহূর্তের যন্ত্রণা। লিখেছেন সুমন্ত চক্রবর্ত্তী

এশিয়া মহাদেশে হরেক জাদুঘর। প্রতিটিতে কালের সাক্ষী কতশত নিদর্শন। কোনোটি প্রাণীর, কোনোটি গাছের, কোনোটি মাছের। ইতিহাস, ঐতিহ্য সংগ্রামের গল্প শোনায়, নব পাঠ দেয়। আমাদের দক্ষিণের জেলা খুলনা শহরে ব্যতিক্রমী জাদুঘর আছে। দক্ষিণ এশিয়ার কোথাও নেই। নাম ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। তাতে আছে বাঙালির মুক্তি, স্বাধীনতার স্পৃহা ও মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক অনেক নিদর্শন। প্রতিটির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের চোখে ভাসে বাংলাদেশের জন্মমুহূর্তের যন্ত্রণা। ঠিকানা খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা (২ নম্বর ফেইজ), ৬ নম্বর সড়ক, ৪২৪ নম্বর বাড়ি। অসাধারণ জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনা, সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম। জানালেন, ‘মানুষের ইতিহাসে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা “ভয়ংকর ও বীভৎস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে”র পর বিশ্বের আর কোনো দেশ বা অঞ্চলেই মাত্র নয় মাসে এত বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়নি, বাংলাদেশের জন্মের পেছনে যত হয়েছে। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এ দেশের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী নির্মমভাবে মেরেছে ৩০ লাখ বাঙালিকে। প্রায় সবাই নির্দোষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্র্বিচার এই গণহত্যায় সারা বিশ্বে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য বিশাল ও বিপুল বিশ্ব জনমত গড়ে উঠেছে।’ তবে আফসাস সবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ৪৯ বছর হয়ে গেলেও এই রাষ্ট্র আজও স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। তবে নানা সময়ে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসে, ক্ষমতাশীলদের প্রশ্রয়ে বহুবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, রাজাকারদের সরকারিভাবে প্রকাশিত তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জন্য সংগ্রামীদের সেখানে ও নানা সময়ে চরম অপমান, হত্যা ও বীভৎস নির্যাতন করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের রাষ্ট্র ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলো পুরস্কার ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নাম রাখা হয়েছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের খ্যাতনামা গবেষক অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বেদনার সঙ্গে অনুভব করলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর দশকের পর দশক বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের দেশের বিজয় লাভকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সে জন্য কাজ করেছেন; স্বাধীনতার সময় করা গণহত্যা ও নির্যাতন নয়। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্যই সাবেক রাষ্ট্রের গণহত্যা, নির্যাতন। এই উদাসীনতার সুযোগে লতা-গুল্মের মতো ইতিহাস বিকৃতি ছড়িয়েছে। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে লড়াই করা মানুষ ও তরুণ দল বিভ্রান্ত হচ্ছে। আগামীর নেত্বত্ব আসলেই জানতে পারছে সত্যি ইতিহাস ও কর্তব্য।’ ফলে তার উৎসাহে ২০১৪ সালর ১৭ মে খুলনায় অনন্য জাদুঘরটি গড়ে তোলা শুরু হয় যার কাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও নির্যাতনের আর্কাইভ গড়ে তোলা, গবেষণা ও পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর তৈরি করা।

প্রথমে ঠিকানা ছিল ময়লাপোতা এলাকায়। সেখানে তারা শেরেবাংলা সড়কে একটি বাড়ি ভাড়া করলেন। ছোট্ট সেই পরিসরে শুরু হলো কাজ। কিন্তু ছোট্ট সেই রুমে দিনে দিনে জমানো মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞের সাক্ষ্যগুলো রাখা যাচ্ছিল না। চেষ্টা করা হয় বড় ভবনে যাওয়ার, নিজস্ব ঠিকানা তৈরির। জাদুঘরের জন্য ভবনের আবেদন করা হলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর। প্রতিষ্ঠার এক বছরে নিজস্ব জায়গা পেল আর্কাইভ ও জাদুঘর। ২০১৫ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডের সরকারি একটি দোতলা বাড়ি তাদের নামে বরাদ্দ দিলেন। ভালোভাবে সংস্কার করা হলো সরকারিভাবে। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ তাতে চলে গেল জাদুঘর। পুরোপুরি নামলেন তারা একাত্তরের গণহত্যা-নির্যাতনের নিদর্শনগুলো সারা দেশ থেকে এনে সংরক্ষণ, বধ্যভূমি ও গণকবরগুলোর সব ধরনের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, সেগুলো চিহ্নিত ও গবেষণা। এই হলো বাংলাদেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। খুলনায় তৈরির অন্যতম প্রধান খুলনা ও দেশের সবচেয়ে বড় চুকনগর বধ্যভূমি এখানেই। সবচেয়ে বড় ও নৃশংস গণহত্যা করেছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। প্রকৃত সংখ্যা এখনো জানা না গেলেও একবারে মেরেছে তারা নৃশংসভাবে ১০ থেকে ১২ হাজার নিরপরাধ, নিরস্ত্র বাঙালিকে।

‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’র প্রধান ফটক আছে। প্রবেশ করলে চোখে পড়ে দুই পাশে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা (কাদের, ব্যাখ্যা) একটি মোটরসাইকেল। মায়ের কোলে নিহত মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য। এরপর আছে সাতই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আলোকচিত্র, ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানিদের নির্মম নির্যাতন, ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা বিজয়ের মুহূর্ত, মুক্তিযুদ্ধে নানা গণহত্যার পর দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের তোলা আলোচিত ছবি। আরও আছে ঢাকার রায়েরবাজার, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের বধ্যভূমির প্রতিচিত্র। ১৭ এপ্রিল মুজিনবগরে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণের ছবি।

প্রবেশ করা যায় তারপর মূল জাদুঘরে। চোখে পড়ে ‘শহীদ গ্যালারি’। দেয়ালজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের নানা ছবি। সেগুলোতে আছে পুরোনো একটি গণহত্যায় ব্যবহার করা মোটরসাইকেল। নম্বর প্লেট আজও আছে যশোর এ-৭৭। তখন যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার গিরিন্দ্রনাথ ঘোষের বাড়িটি দখল নেন রাজাকাররা। তৈরি করেন টর্চার সেল বা নির্যাতন কেন্দ্র। গিরিন্দ্রের ছেলে অনিল কুমার ঘোষের মোটরসাইকেল দিয়ে রাজাকাররা মনিরামপুর এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালাতেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মে খুলনার বটিয়াঘাটার বাদামতলা গণহত্যার শিকারদের অন্যতম ছিলেন সৌরভী গোলদার ও মাধবচন্দ্র বৈরাগী। সেদিনের নিষ্ঠুরতার সাক্ষী তাদের রক্তমাখা কাপড়। মাধবের পকেটে পাওয়া গেছে রক্তমাখা কটি টাকা। টাকাগুলো তার মৃতদেহে বুলেটের আঘাতের স্মারক।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশে গণহত্যার নানা নিদর্শন আছে জাদুঘরে। শহীদ বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কৃতী অধ্যাপক ও ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি, বিখ্যাত শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের দুটি টাই ও তার ডায়েরি, বিবিসির নামকরা সংবাদদাতা নিজামউদ্দীন আহমেদের কোট, শহীদ সাংবাদিক ও নির্মম নির্যাতনের শিকার সেলিনা পারভীনের কলম ও শাড়ি। শাড়িটি পরা অবস্থায় তিনি মারা গিয়েছিলেন। ইত্তেফাকের বার্তা ও কার্যনির্বাহী সম্পাদক শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও লেখার পা-ুলিপি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার লেখা বই, শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. আলীম চৌধুরীর ভিজিটিং কার্ড, ল্যাম্প, দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহার করা ডেন্টাল টুল কিট ও ডায়েরি। তাদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা এগুলো দান করেছেন।

প্রথম গ্যালারিতে ঢুকতেই আছে কাচ ঘেরা কটি বাক্স। একটি বাক্সে একাত্তরে স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দিনকে লেখা প্রধানমন্ত্রী ও সমরনায়ক তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি। কিংস স্টক বা বক মার্কা সিগারেটের খালি বাক্সের সাদা অংশে চরম ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী দুই লাইনে লিখেছেন, ‘জোহরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেয়ো। ওই মতো ব্যবস্থা (দুই)।’ এত দিন সংরক্ষণ করেছেন ‘আর্কাইভ ৭১’র নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক প্রণব সাহা। তার পক্ষে ঐতিহাসিক সংগ্রামের চিঠিটি হস্তান্তর করা হয়েছে এই কর্তৃপক্ষের কাছে। একাত্তরের গণহত্যার নানা স্মৃতির স্মারক তিনি হস্তান্তর করেছেন। আছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ডায়েরি, ছবি, তার হাতের লেখা। ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার বাগাট গ্রামের গণকবরের মানুষের মাথার খুলি ও হাড় আছে বাঁধাই কাচের ভেতরে।

একাত্তরেই শহীদ সেকান্দার আলী সেরনিয়াবাতের তিন সন্তান। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে তাকে তিন হাজার টাকার চেক প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু। শহীদ সন্তানদের শেষ স্মৃতি হিসেবে সেই চেকের টাকা আর তোলেননি বাবা। রাখা আছে পাশের বাক্সে। আরও কক্ষগুলোতে আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য অনেক দলিল জাদুঘরের পেছনে কাচ ঘেরা কক্ষে আছে ক্ষয়ে যাওয়া একটি বয়লার। খুলনার খালিশপুরের ‘প্লাটিনাম জুট মিল’র এই বয়লার পাকিস্তান সেনাবাহিনী জ্যান্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলার কাজে লাগাত। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেন, তাদের ধরে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য আদায়ের জন্য অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। কাজ না হলে বয়লার জ্বালাত তারা। নির্যাতিতকে বেঁধে পায়ের দিকটা বয়লারে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। পা পুড়ে যেত। এরপর শরীরের বাকি অংশ বয়লারে ফেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো। বয়লারে কত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, এর কোনো হিসাব হয়নি।

জাদুঘর জানিয়েছেন, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নানা মাত্রার বই আছে পাঁচ হাজারের বেশি। একাত্তরের গণহত্যা ও নারকীয় নির্যাতনের ওপর বাঁধানো ছবি আছে ১৫৫টি। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ‘শিল্পীর চোখে গণহত্যা-নির্যাতন আর্ট’ শিরোনামের ছবি আছে ১২টি। ২০১৫ সালে ‘শিল্পীর চোখে গণহত্যা নির্যাতন’ নামের আর্ট ক্যাম্পাসের ছবি আছে ১৭টি। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রামাণ্যচিত্রের ২৫০টি সিডি আছে। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার আরও নানা নিদর্শন আছে।

গ্যালারিতে আরও আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করা নানা সরঞ্জাম। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তখনকার পোশাকসহ অনেক কিছু। সেগুলোর একটি দোতলায় গ্যালারিতে চোখ পড়ে কালো এক টেলিফোন সেট। টেলিফোন সেটটি খুলনার খানজাহান আলী রোডের মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবীরের বাড়ি ‘কবীর মঞ্জিল’-এর। বাড়িটি বিপ্লবী কাউন্সিলের প্রধান কার্যালয় ছিল। টিঅ্যান্ডটির ৪৯২৬ নম্বরের সেটটি মুক্তিযুদ্ধে প্রয়োজনীয় খবর, নির্দেশ ও নির্দেশনা এবং কর্মকৌশলের প্রধান সহায় ছিল। ‘শহীদ গ্যালারি’তে আরও আছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের টাই ও কলম। তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের পরম স্মৃতিচিহ্নগুলো জাদুঘরে দান করেছেন।

বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর সপ্তাহের সোমবার বন্ধ। তা ছাড়া প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা। জাদুঘরে প্রবেশ ফি ৫ টাকা।

‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা কাজ নিয়মিত করে। গণহত্যার বিস্মৃত তীর্থভূমি যেমন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত, গণহত্যা-নির্যাতনের অনলাইন ও অফলাইন আর্কাইভ গড়ে তোলা, শিশু-কিশোরদের নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনীর আয়োজন, প্রতিযোগিতা; প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়ে ‘গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট’ ও ‘শহীদ স্মৃতি’ গ্রন্থমালা প্রকাশ, গণহত্যা-নির্যাতনের জাতীয়, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও শহীদ স্মৃতি বক্তৃতার আয়োজন অন্যতম। সারা দেশে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের গবেষক তৈরি, নতুন প্রজন্মের এ বিষয়ে গবেষণা ও কাজের জন্য ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি, একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে দেনদরবার ও ওকালতি করা তাদের কাজের অন্যতম ক্ষেত্র। এই গ্রন্থাগারে মুক্তিযুদ্ধের হাজারেরও বেশি বই, আলোকচিত্র, অডিও-ভিডিও ক্লিপ ও দলিলাদি আছে। মুক্তিযুদ্ধে প্রকাশিত পত্রিকা ‘দৃষ্টিপাত’, ‘পূর্বায়ন’, ‘সপ্তাহ’, ‘দেশের ডাক’, ‘ত্রিপুরা’, ‘জাগরণ’, ‘গণসংহতি’ ইত্যাদি। সারা বিশ্বের গণহত্যাসংক্রান্ত নানা সংবাদ নিয়ে জেনোসাইড মিডিয়া ডাইজেস্ট তৈরির কাজ চলছে।

স্থানীয় গবেষক তৈরির জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে বছরে দুটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট প্রদান করেন তারা। ইতিহাসবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, আর্কাইভিস্ট, রাজনীতিবিদ, আইনবিদরা কোর্সে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ খুলনায় হয়েছে। ৩১ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। রাজশাহী ও রংপুরে প্রশিক্ষণ হয়েছে ২০১৭ সালে। নিয়মিত আয়োজন করা হয় শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার। এ পর্যন্ত পাঁচটি শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা, ১১টি জাতীয় ও ৩টি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমিতে ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সেমিনার করা হয়েছে। তখন ৬টি দেশের ১৩ জন গবেষক ঢাকায় গবেষণাপত্র পাঠ করেন। দেশ-বিদেশের প্রায় ৫০০ তরুণ গবেষক যোগ দিয়েছেন। গণহত্যার বিস্মৃত স্থানগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বধ্যভূমিগুলোতে ফলক নির্মাণ করা হচ্ছে। খুলনা জেলার ৫০টি গণহত্যাস্থল বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছেন।

জাদুঘরের প্রকাশনা খাত রয়েছে। সেগুলোর মাধ্যমে আর্কাইভ ও জাদুঘর আয় করে। অন্যতম বই‘দামেরখ- গণহত্যা’, ‘লালমাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্চিবাড়ি গণহত্যা’, ‘মুজাফফরাবাদ গণহত্যা’, ‘বেলতলী গণহত্যা’, ‘কালিগঞ্জ গণহত্যা’, ‘বিনোদবাড়ী মানকোন গণহত্যা’, ‘বাদামতলা গণহত্যা’, ‘গোলাহাট গণহত্যা’, ‘পাহাড়তলী গণহত্যা’, ‘কাঠিরা গণহত্যা’, ‘হাতিয়া গণহত্যা’, ‘কাঠিপাড়া গণহত্যা’, ‘জগৎপুর গণহত্যা’, ‘ঊনসত্তর পাড়া গণহত্যা’, ‘বালারখাইল গণহত্যা’, ‘বহলা গণহত্যা’, ‘কল্যাণপুর গণহত্যা’, ‘পাঁচগাঁও গণহত্যা’, ‘দেয়াড়া গণহত্যা’, ‘বেশাইন খান গণহত্যা’, ‘চুকনগর গণহত্যা’, ‘জগত্মল্লপাড়া গণহত্যা’, ‘ডাকরা গণহত্যা’। এই বইগুলো প্রকাশ ও বিক্রি করেন তারা।

প্রতিষ্ঠার পর ৫ বছর পেরিয়ে বেশ অর্জন আছে আর্কাইভ ও জাদুঘরের। তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সরকার জাতীয় উদ্যান তৈরি করে তাতে গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে ভাস্কর্য উদ্যান নির্মাণ করেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে। ‘মুক্তিযুদ্ধ ও ত্রিপুরা ১৯৭১’ শিরোনামে ত্রিপুরা জাদুঘরে সজ্জিত গ্যালারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের ওপর স্মারক খাম প্রকাশ করেছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুকে হুমকি দেওয়া চিঠি।

‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ ট্রাস্টের মাধ্যমে চলে। শুরু থেকে ট্রাস্টের সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন। সম্পাদক ডা. শেখ বাহারুল আলম। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান, সাংবাদিক ও গবেষক শাহরিয়ার কবির, কবি তারিক সুজাত, শংকর কুমার মল্লিক, চৌধুরী শহীদ কাদের, মো. মাহবুবর আলম, মুহাম্মদ আলমগীর, আবুল কালাম আজাদ ও হুমায়ুন কবির।

২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের সহযোগিতায় জাদুঘরের ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র’ স্থাপিত হয়।

অর্থসহায়তা দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। ব্যক্তিগত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি থোক বরাদ্দ, মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ সাহায্য ও নিজেদের বই বিক্রি করে কাজ করেন তারা। উপপরিচালক রোকনুজ্জামান বললেন, ‘প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন দর্শনার্থী আসেন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। এত দিন পরে কেন এটি গড়ে তোলা হলো বলেন তারা। আমরা বলি। তারা সবাই ঘুরে দেখেন, পড়েন। জানেন ও কাঁদেন। প্রেরণা পান।’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের টাকায় তাদের ছয়তলা ভবন তৈরি হচ্ছে। উন্মুক্ত গ্যালারি, আরও কক্ষ, আধুনিক গ্রন্থাগার, ৩০০ আসনের বিরাট সেমিনার করার মতো হলরুম, আর্কাইভ, অনেকগুলো গ্যালারি ইত্যাদি হবে।

দেশ রূপান্তর, সুমন্ত চক্রবর্ত্তী | ২০ জানুয়ারি, ২০২০

Post a comment