Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

Bangladesh War: Report from Ground Zero ।।মুনতাসীর মামুন

  • মুনতাসীর মামুন

মানস ঘোষের সঙ্গে আমার পরিচয় দু’যুগের। যদি স্মৃতি বিভ্রম না হয়ে থাকে, তাহলে বলব, প্রথম পরিচয় দিল্লিতে। সাল ১৯৯৮, পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে একমাস ধরে আলাপ করে ঢাকা ফিরছি। করাচি থেকে দিল্লি। আমার সঙ্গে ছিলেন ঢাকার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মহিউদ্দিন আহমদ। যিনি মাত্র কয়েকদিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি বোধহয় দিল্লিতে তার কোনো বন্ধু-কে বলে থাকবেন যে, আমরা সদ্য পাকিস্তান থেকে ফিরেছি। সাংবাদিক হিসেবে মানস ঘোষ সেটি শুনে থাকবেন। তিনি এলেন আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে। পরদিন স্টেটসম্যান পত্রিকার দিল্লি সংস্করণে সেই সংবাদ ছাপা হলো। বিষয়: পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকরা ১৯৭১ সালে কী ভেবেছিলেন। মানস ঘোষ হতে পারে তখন দিল্লি সংস্করণের সঙ্গে যুক্ত বা হতে পারে দিল্লি এসেছিলেন কাজে।

তারপর দীর্ঘদিন দেখা হয়নি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে মানস ঘোষ ঢাকায় এসেছিলেন কিন্তু পরিচয় হয় নি। শেখ হাসিনা তাঁকে চিনতেন। তার জেনারেশনের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তখন জানলাম যে, তিনি বাংলাদেশ যুদ্ধের ওপর তরুণ সাংবাদিক হিসেবে প্রচুর রিপোর্ট করেছেন। ১৯৭২ সাল থেকে স্টেটসম্যানের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় ছিলেন। সেই সময় আমাদেরও সাংবাদিকতার শুরু কিন্তু আলাপ হয় নি। মানস ঘোষ ক্রমে আমাদের মানসদা হয়ে গেলেন। আমরা কলকাতা গেলে অবশ্যই তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তিনি ঢাকায় এলে আমার বা শাহরিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

একাত্তর সালে প্রকাশিত স্টেটসম্যান পত্রিকা।

এক সময় বাংলা স্টেটসম্যান প্রকাশ শুরু হলো। তিনি সম্পাদক। আমার, শাহরিয়ার ও আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ছাপাতে লাগলেন। বলতে দ্বিধা নেই মানসদাই পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের প্রিয়জন হওয়ার কারণ তাঁর মধ্যে কোনো ভণিতা নেই, বন্ধু বৎসল এবং আন্তরিক, স্পর্শকাতরও বটে। ঘটিদের চেয়ে আমাদের মতো বাঙালদের প্রতি তার ভালোবাসা অধিক, বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা সমধিক। আমার মনে আছে, মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননার কথা উঠলে প্রথমেই আমি ও শাহরিয়ার কবির মানস ঘোষের নাম প্রস্তাব করেছিলাম। এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তার অবদানের কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

মানসদার সঙ্গে ঢাকা-কলকাতায় যেখানে দেখা হয়েছে তখনিই মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি লেখার কথা বলেছি। তার মুখে যুদ্ধের বর্ণনা অনেক শুনেছি, ১৯৭২ পরবর্তীকালের ঘটনাও। এবার করোনাকালে চেন্নাইয়ে তার কন্যার কাছে থাকার সময় বোধহয় তিনি মানসিক অবসর পেলেন। পাণ্ডুলিপি শেষ করার পর আমাকে জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন নিয়োগী বুক তার গ্রন্থটি প্রকাশ করবে। যারপর নাই খুশি হয়েছি। আর আমাকে কিছু একটা লিখতে বলায় সম্মানিত বোধ করছি। আজ ৫০ বছর পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা একজন ‘বিদেশি’ লিখছেন তা ভাবতেও ভাল লাগছে। আসলে আমাদের জেনারেশনের কাছে ১৯৭১ সাল নস্টালজিক শুধু নয় জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা, এখনও।

বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে সরকার কর্তৃক বিশেষ অভিধায় সম্মানিত মানস ঘোষের বইটি একটি বিশেষ উপহার। আর ৫০ বছর পর জীবনের একটি আরদ্ধ কাজ তিনি সম্পন্ন করতে পারলেন এটিও তার মানসিক শান্তির বড় কারণ।

মানস ঘোষের বইয়ের নাম Bangladesh War: Report from Ground Zero. তার গল্পের শুরু ১৯৭১-এ নয়, ১৯৭০ সালে। সবে যোগ দিয়েছেন ভারতের সবচেয়ে পুরণো ও নামী পত্রিকা স্টেটসম্যানে। বলা যেতে পারে [cub reporter]. দ্বিতীয় এশিয়ান হাইওয়ে কার র‌্যালি শুরু হয়েছে তেহরান থেকে ঢাকা। গন্তব্য ঢাকা। ৬০ জন প্রতিযোগী যোগ দিয়েছেন। বনগাঁ সীমান্তে তিনি গেছেন র‌্যালি বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে। এর চারদিন আগে সত্তরের সাইক্লোন তচনছ করে দিয়েছে বাংলাদেশের উপকূল। ত্রাণ পৌঁছায়নি তখনও। মানুষ ক্ষুব্ধ। বনগাঁয় তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো তিনজন বাঙালি কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা তাঁকে তাদের ক্ষোভের কথা, আসন্ন নির্বাচনে যে শেখ মুজিবের ভূমিধ্বস জয় হবে তার কথা বলছিলেন। তারা চাচ্ছিলেন এইসব ‘সেন্টিমেন্ট’ বা ‘সংবাদ’ যেন সাংবাদিক তাদের কাগজে তুলে ধরেন। তাদের খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সাঁতারু ব্রজেন দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন যিনি তখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন।

ব্রজেন দাস

ভারত কেনো, পশ্চিমবঙ্গের মানুষজন বা সাংবাদিকরা বাঙালিদের সম্পর্কে তেমন ওয়াকেফহাল ছিল না। আগ্রহীও ছিলেন না। মানস ঘোষেরও তেমন ধারণা ছিল না পূর্ব পাকিস্তান ও এর অধিবাসীদের সম্পর্কে। সেই তিন কর্মকর্তা দেখালেন ভারত যে ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে তা পড়ে আছে গুদামে অথচ মানুষ ত্রাণ না পেয়ে মারা যাচ্ছে। কারণ একটাই, ভারত হচ্ছে শত্রু রাষ্ট্র।

কলকাতা ফিরে ব্রজেন দাসের সঙ্গে আলোচনা করলেন। দাস বললেন,

“My fellow Bangalis of all religions are smarting under tremendous humiliation. The grave injustice of every conceivable kind that they had to endure daily had turned them against the concept of Pakistan.”

দাস আরো জানালেন ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন সব কিছু পালটে দেবে। তিনি আরো জানালেন, র‌্যালির ভারতীয় প্রতিযোগীদের কাছ থেকে খবর জানতে। র‌্যালিতে প্রথম হয়েছিলেন মহেন্দ্র লাল ওয়ালি, ভারতীয়। তিনি ঘোষকে জানালেন, তিনি ভারতীয় এবং বাংলা বুঝতে পারেন জেনে সাধারণ বাঙালিরা তাকে কী ভাবে বরণ করেছে।

এই যে প্রতিবেশি রাষ্ট্র, যারা বাঙালি তাদের মানসজগৎ বদলে যাচ্ছে এটি ছিল খবর।  cub reporter মানস ঘোষ সেটি বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু তাঁর আগের জেনারেশনের সাংবাদিকরা তা বুঝতে পারেন নি। তিনি যখন এ বিষয়ে রিপোর্ট করতে চাইলেন তখন ভৎর্সনার সম্মুখীন হলেন। স্টেটসম্যানের বোরবারে সাময়িকী দেখতেন অপেক্ষাকৃত তরুণ সুনন্দ দত্ত রায়। তিনি সবশুনে মানস ঘোষ-কে লিখতে বললেন। এক সপ্তাহ পর স্টেটসম্যানের রোববারের পাতায় ছাপা হলো- ‘When Brother meet Brother’। এই শিরোনাম মোটামুটি ইঙ্গিত দিল কী হতে যাচ্ছে, প্রচুর প্রশংসা পেলেন। মানস ঘোষ হয়ে উঠলেন পরিচিত সাংবাদিক। তিনি বাঁধা পড়লেন বাংলাদেশের প্রেমে। সেই যে যাত্রা শুরু হলো তাঁর বাংলাদেশের সঙ্গে এখনও তা অব্যাহত।

বইয়ের তৃতীয় অধ্যায় Ambivalent India – তে তিনি যে বিবরণ দিয়েছেন তা পরবর্তীকালে আমার গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল তার কারণ সেখানকার আমলাতন্ত্র ও এলিটদের দৃষ্টিভঙ্গি। সেই সময় উত্তর ভারতের আমলারা সাউথ ব্লক ডমিনেট করতেন। সাংবাদিকদেরও অনেকে, যেমন, তৎকালীন স্টেটসম্যানের দিল্লির আঞ্চলিক সম্পাদক কুলদীপ নায়ার। পাকিস্তানের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নমনীয়। স্বাধীনতার পর তাদের অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। বাংলাদেশ-কে তারা মনে করতেন vasal state হিসেবে। ১৯৭১ সালে কুলদীপ নায়ার মানস ঘোষের সঙ্গে আলাপ করতে চান নি বাংলাদেশের বিষয়ে।

ভারতের অন্য অংশের কথা বাদ দিই, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি পূর্বদিকে বসবাস করে। তাদের একটি ধারণা ছিল মুসলামনরা হিন্দুদের পূর্ববঙ্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় ইতিহাসের ন্যারেটিভ এই ধারণা সৃষ্টি করেছে। ঐ ন্যারেটিভে ধারণা দেওয়া হয়নি যে একই ভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার থেকে সমপরিমাণ বাঙালি মুসলমান ও বিহারি মুসলমানকেও বস্ত্যুচ্যুত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সম্পাদকদের ধারণাও এরকম ছিল। এখন খানিকটা ব্যতিক্রম হলে দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একই আছে। দুটি ঘটনার উল্লেখ করছি। বছর কয়েক আগে কলকাতায় বাংলাদেশের এক কূটনীতিবিদ নামী এক পত্রিকার সম্পাদক সম্পর্কে বললেন, মমতা ব্যানার্জীর অ্যাপয়ন্টমেন্ট পাওয়া যায় কিন্তু এই সম্পাদকের নয়। এমনই তার দম্ভ! আরেকদিন, মানস ঘোষ তখন বাংলা স্টেটসম্যানের সম্পাদক। আমি আর গাফফার চৌধুরী তার রুমে বসে গল্প করছি। গাফফার ভাই লন্ডন থেকে এসেছেন। কথায় কথায় দৈনিক বর্তমান এর কথা উঠল। বরুণ সেনগুপ্ত এর সম্পাদক। গাফফার চৌধুরীর বন্ধু ১৯৭১ সাল থেকে। মানসদাকে তিনি বললেন, তিনি একটু বরুণদার সঙ্গে কথা বলতে চান। মানসদা গাফফার ভাইকে ফোনে সংযোগ দিয়ে দিলেন। পাঁচ মিনিট কথোপকথনের পরও বরুণ সেনগুপ্ত আবদুল গাফফার চৌধুরীকে চিনতে পারলেন না। এমনই সাংবাদিক সম্পাদক। যা হোক এই অধ্যায়টি ১৯৭০-৭১ সালে কী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভারতীয়দের তা বুঝতে সহায়তা করে।

এই অধ্যায়েই মানস ঘোষ বর্ণনা করেছেন কী ভাবে তিনি বিবিসি শুনে বাংলাদেশের খবরাখবর রাখতেন। তখন এ বিষয়ে তার আলাপ হতো ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সুখময় চক্রবর্তী ও রাজ্য সভায় সিপিআইয়ের সংসদ সদস্য ভূপেশ গুপ্তের সঙ্গে। তারা তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হয়ে পাকিস্তানের বিষয়বলী মনিটরিং করছিলেন। আলাপ হলো বিএসএফের গোলক মজুমদার ও মুজিবের প্রতিনিধি চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে। আলাপ হলো বনগাঁ ও সীমান্তে গোলক মজুমদারের প্রতিনিধি কে. বি. সিং এর সঙ্গে। ইলামিত্রের স্বামী রমেন মিত্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা হলো। তাঁর এ বিবরণ কাহিনির ভেতর কাহিনি তুলে ধরে। বাঙালি মসুলমান বা মুজিবের প্রতি আমলা ও এলিট ও সাংবাদিকদের ধারণা [যারা সব জান্তা]। অন্যদিকে, মুজিব যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্বাধীনতার, ইন্দিরা গান্ধীও যে তা জানেন এবং তিনি ঘটনাবলি মনিটরিং করছেন সেই ধারণাও পাই। রমেন মিত্রের সঙ্গে যোগযোগ ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের খবরাখবরও তিনি পাচ্ছিলেন। রমেন মিত্র তাঁকে বলেছিলেন- মুজিব যদি জেতেন তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান কী করতে পারে তা। গাফফার খান তাঁকে জানিয়েছিলেন-

“I don’t know what these options are but I am sure the Pakistani establishment, especially the military will not hand over the reins of power to Sheikh Mujib because of their intense hatred and mistrust for Bengalis in general and Mujib in particular.”

১৯৭৮ সালে করাচিতে আমি পাকিস্তানের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভূট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ১৯৭০-৭১, ভূট্টো ইয়াহিয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী তাঁদের বাসায় আসতেন। তাঁর মা নুসরাত-কে তিনি বলেছিলেন,

“জানো নুসরাত, ওরা আমাদের পাকিস্তানী মনে করে না। কিন্তু কেন? আমরাতো অন্য সকলের মতোই পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছি, অথচ সবাই এমন ভাব করে যেন আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।’ বললেন বেনজীর, ‘আমাদের স্কুলগুলিতেও  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরণের কথা বলা হতো, বাঙালিরা ভাত খায়, ছোটখাটো। আমরা গম খাই, আমরা লম্বা চওড়া। বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব একেবারে। ছোট হলেও আমি বুঝতাম, এ ধরণের মনোভাব অন্যায়। বড় হয়ে বুঝলাম বাঙালিরা কী বলতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমি তা উপলন্ধি করেছি। সেটি হলো, আমার মতো অন্য দশজনও পাকিস্তানি। আমার শৈশবে যা শুনেছি আর বুঝিনি তা আমাকে এখন তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে। আমার মনে হয়েছিল, পাকিস্তান যদি ভাঙ্গে তাহলে ভাঙবে পশ্চিমের হটকারিতার জন্যেই। বাঙালিরা পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি। তারা এক লোক এক ভোট চায়, আমরা তা দিতে প্রস্তুত ছিলাম না। একারণেই গোলযোগটা শুরু হয়।”

যা হোক মানস ঘোষ রমেন বাবুর কথা জানালেন গোলক মজুমদারকে। গোলক বললেন, ‘Let us wait and see.’ মানস ঘোষ অনুভব করেছিলেন বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনাটা যে এত বড় এবং সবকিছু ওলটপালট করে দেবে তা ভাবেন নি। তিনি মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অন্যদের এ উপলব্ধি ছিল না। সে জন্য বাংলাদেশ যুদ্ধে মানস ঘোষ এমন সব প্রতিবেদন পাঠাতে পেরেছিলেন যা তাঁর ক্যারিয়ার এর পথ সুগম করে দেয়। অন্যরা তা উপলব্ধি করেন নি। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এখানেই তফাৎ হয়ে যায়।

নির্বাচনী মুজিবের ভূমিধ্বস জয় হলো। ভারতের সংবাদপত্রগুলি তখন মনোযোগ দিল প্রতিবেশি দেশের ঘটনাবলিতে। প্রথম পৃষ্ঠায় পাকিস্তানের খবরাখবর। তবে, অধিকাংশ খবরই ছিল এজেন্সির। তাদের খবরের ভিত্তি ছিল পশ্চিমের কট্টরপন্থি দুই উর্দু পত্রিকা ‘জং’ ও ‘নড়াই ওয়াক্ত’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মানস ঘোষ চতুর্থ অধ্যায়ে দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন নির্বাচনোত্তর পরিপস্থিতির। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৫৮ সালেই মুজিব স্বাধীনতার ব্যাপারে নেহেরুকে চিঠি লিখেছিলেন। এবং পরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তাতে সম্মতি জানিয়েছিলেন। তবে সালটা হবে ১৯৫৮ নয় ১৯৬২। ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক ব্যানার্জির বইতে এ সম্পর্কে বিবরণ আছে। আামর গবেষণায় আমি জেনেছি, এ যোগাযোগ ছিল এবং অবশেষে ১৯৬৯ সালে মুজিব লন্ডন যান তখন ইন্দিরা গান্ধীর দূতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। কী হতে পারে তার ধারণা দিয়েছিলেন মুজিব। যুদ্ধ শুরু হলে, নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, ভারতীয় সাহায্য সব বিষয়ে কথা বলেছিলেন। ইন্দিরা সম্মতি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। বলেছেন, তিনি তখন তাঁর বাবার সঙ্গে ছিলেন। এ কারণে, বঙ্গবন্ধু চিত্তরঞ্জন সুতারকে পাঠিয়েছিলেন কলকাতায়। যুদ্ধের আগে মুজিবের প্রস্তুতির কথা জানাতে ত্রৈলোক্য মহারাজ গিয়েছিলেন দিল্লি। অর্থাৎ, হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। প্রস্তুতি তাঁর ছিলই। তাঁর ছক মতোই তিনি এগোচ্ছিলেন। মানস ঘোষের ন্যারেটিভে এ তথ্যগুলি আছে। ইয়াহিয়া যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলছিলেন তখন মানস ঘোষ রমেন মিত্র ও গোলক মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তারা দুজনই বলেছিলেন, এগুলি কথার কথা।

৭ মার্চের বক্তৃতার পর একটি কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনার উল্লেখ করেছেন মানস ঘোষ। ১০ মার্চ কলকাতা প্রেসক্লাবে ঢাকার সংবাদপত্রের দুজন আলোকচিত্রি এলেন। তারা ৭ মার্চ ও ঢাকায় ঘটতে থাকা বিভিন্ন ঘটনাবলির কিছু ছবি এনেছেন, তা বিক্রি করতে চান। স্টেটসম্যানের বার্তা সম্পাদক দাম শুনে বললেন, খুব বেশি দাম। আনন্দবাজার ছবিগুলি কিনে নিলো এবং পরদিন বড় করে প্রথম পাতায় ছাপাল। সকালে চারগুণ বেশি দামে আনন্দবাজার অনেক- কে কিনতে হলো। মনে হয় সে সময়ই পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রিকাগুলি ঢাকার দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে।

এল ২৫ মার্চ। মানস ফোন করলেন গোলক বাবু, রমেন বাবু, ব্রজেন দাস, চিত্তরঞ্জন সূতারকে। কেউ সীমান্তের ওপারের কোনো খবর দিতে পারলেন না। অন্যদিকে, কলকাতায় নকশাল উপদ্রবের ফলে পত্রিকাগুলি তখনও সীমান্তের ঘটনায় মন দেয়নি। ইতোমধ্যে সায়মন ড্রিংগের রিপোর্ট বেরিয়ে গেছে। ভারতীয় কাগজগুলি তার কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা ইউএন আই আগরতলা থেকে গণহত্যার খবর দেয়া শুরু করল। এখানে ঘোষ একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যা আমাদের জানা ছিল না।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের গণহত্যার খবর

ইউএন আই রমনা কালি বাড়ি ধ্বংসের খবর দিয়েছিল। গণহত্যার ঘটনাও ঘটেছিল সেখানে। ভয়েস অব আমেরিকা মার্কিন নাগরিক ড. জন রোডের প্রত্যক্ষদর্শীর একটি বিবরণও দিয়েছিল। সৈন্যরা মৃতদেহ সরাতে দিচ্ছিল না। উদাহরণ হিসেবে সেগুলি পড়েছিল। কালিবাড়ি ছিল নেপালিদের পবিত্র তীর্থ। এটি ধ্বংস হওয়ায় নেপাল সরকার পাকিস্তানি জেনারেলদের কাছে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানায়। ফলে নেপাল-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি হয়। ঘোষ এ রিপোর্টটি করেছিলেন স্টেটসম্যান-এ। তার সোর্স ছিলেন কলকাতার রুশ কূটনীতিবিদ গুরগিনভ।

২৭ তারিখ ভূপেশগুপ্ত ও সুখময় সুখোপাধ্যায় খবর পাঠালেন মানস-কে। জানতে চাইলেন ঢাকার খবরাখবর। মানস জানালেন তিনি কাব রিপোর্টার, কিছুই জানে না। গুপ্ত রাগ করে বললেন- “what are you reporter for? working in a paper like The Statesman?”

লজ্জা পেলেন ঘোষ। পরদিন সকালে কাগজে দেখলেন, ব্যাংকক থেকে বিদেশি সাংবাদিকের রিপোর্টের উদ্ধৃতি যেখানে গণহত্যার খবর দেয়া হয়েছে। মানস তখনই পেট্রাপোল যেতে চাইলেন। কিন্তু তার ওপরওলা বললেন, যাওয়া যাবে না, তিনি খুব জুনিয়র।

দমলেন না মানস। তিনি অফিসে তার অফ ডে-তে সিনিয়র চন্দ্র শেখর সরকারের সঙ্গে গেলেন বনগাঁ। পকেটে ৫০ টাকা। দেখা করলেন বিএসএফ কমান্ডার কে বি সিংয়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন পাকি সৈন্যরা গণহত্যা চালাচ্ছে, তার চলে যাওয়া উচিত। মানসের কী মনে হলো, তিনি গেলেন না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তখন দেখেন একজন ইতালিয়ান সীমান্ত পেরিয়ে কে বি সিংয়ের সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁর ঘরে গিয়ে অনেকক্ষণ কথা বললেন। কে বি কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে মানস-কে অনুরোধ করলেন ইউরোপীয় ভদ্রলোককে কলকাতায় পৌঁছে একটা হোটেলে তুলে দিতে। ফেরার পথে ইতালিয়ান ফলসেটির কাছে গণহত্যার লোমহর্ষক বিবরণ শুনলেন মানস। রাত ১০টায় পৌঁছলেন অফিসে। একটা রিপোর্ট লিখলেন। কিন্তু তাকে তো কোনো এসাইনমেন্ট দেয়া হয়নি। রিপোর্টটি চুপিসারে তিনি চিফ সাব এডিটর বিল নোনির টেবিলে রেখে এলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন ননি রিপোর্টারদের রুমে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানস ঘোষ কে’?

তারপরের বর্ণনার দরকার নেই। নোনি সেই রিপোর্ট ছাপলেন, পরদিন সকাল থেকে হৈচৈ। স্টেটসম্যানের চিফ রিপোর্টার সত্য বোস এসে জানালেন সম্পাদক নানপোরিয়া তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন সকাল ৯ টায়। বোস বললেন, তোমার চাকুরিতো যাবেই আমরাও বিপদে পড়ব। “That is the problem of your generation. you are extra clever. Actually you are too clever by half.”

দুরু দুরু বক্ষে সকালে দেখা করলেন সম্পাদকের সঙ্গে। নানপোরিয়া তার পরিচয়, কাগজে কোন বিট করেন জানতে চাইলেন। তারপর বললেন, তোমার রিপোর্ট চমৎকার। এখন থেকে সীমান্তের ওপারের রিপোর্ট তুমি করবে। সকাল ৬টায় প্রতিদিন গাড়ি তোমার কাছে রিপোর্ট করবে। তবে, “Do not get too adventurous. Do not cross the border or be fool hardy.” কারণ, কিছু ঘটলে অফিস দায়দায়িত্ব নেবে না।

তখন থেকে মানস ঘোষের সঙ্গে বাংলাদেশের রোমন্সের শুরু। এর ভিত্তি ছিল কমিটমেন্ট। মানস ঘোষ লিখেছেন-

“An inner compulsion to stand by the defenseless and persecuted people also firmed up my resolve to cross the border and do on-the-spot reporting and let the world know what kind of untold atrocities the Pakistanis were committing against the Bangalis.”

এই কমিটমেন্টের কারণেই মানস ঘোষ মানস ঘোষ হয়ে উঠতে পেরেছেন। গত তিনযুগ যখন এখানে বিএনপি জামায়াতের কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা হাপিস হয়ে গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সিভিল সমাজ বিপদে পড়েছে তখনই তিনি স্টেটসম্যানে তা লিখেছেন। বিএনপি জোট সরকার তাকে বাংলাদেশ person non grata ঘোষণা করেছিল। আর সেই কারণেই আমাদের এবং পরবর্তী জেনারেশনের কাছে মানস ঘোষ স্রেফ মানস দা।

তারপর থেকে মানস ঘোষ যাওয়া শুরু করলেন সীমান্তে। ৩০ মার্চ সাতক্ষীরা দিয়ে ঢুকে গেলেন যশোর। যাবার পথে চাঁচড় রাজবাড়িতে গণহত্যার নিহতদের লাশের স্তুপ দেখলেন। সেটি এত ভয়ানক ছিল যে তার সঙ্গী ক্যামেরাম্যান সুধীন রায় তার ছবি তুলতে চাননি। ফিরে এসে রিপোর্ট করলেন। প্রথম পাতায় তার সচিত্র বিবরণ ছাপা হলো। লিখেছেন ঘোষ- “That day, my report became Calcutta’s talking point and copies of the Statesman were sold at a premium.”

স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত যশোরের চাঁচড়া রাজবাড়ির ছবি।

নানপোরিয়া তাকে আবার ডেকে পাঠালেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ শুনে উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন আগরতলা, বেনাপোল, বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীরা আসছে। নানপোরিয়া বললেন, শরণার্থীদের আসতে দেওয়া উচিত হবে না। দরকার হলে গুলি করতে হবে। ভারতীয় অনেক জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের মতামত তাই। মার্চ এপ্রিলের যে বিবরণ মানস ঘোষ দিয়েছেন তাতে বোঝা যায় বাংলাদেশ প্রশ্নে নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও পার্থক্য ছিল। কেন্দ্রীয় মন্তী আসামের ফখরুদ্দীন আলী আহমদ বলেছিলেন, ‘হামনে কেয়া পড়োশি দেশো মে ডেমোক্র্যাসি ওয়াপস লানে কা ঠিকা লিয়া হ্যায় কেয়া?’ এই ফখরুদ্দীন এক সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। আরো পড়েছি, আসামের বাঙাল খেদা আন্দোলনেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাব পছন্দ হয় নি পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরণ সিংয়ের। নানপোরিয়া এসব তথ্য জানিয়েছিলেন মানস-কে।

মানস ঘোষ মনে করেছেন এবং এখনও করেন, পাকিস্তান সরকারের নীতির কারণে শরণার্থীরা আসতে বাধ্য হয়েছিল। আজ ৫০ বছর পর নতুন প্রজন্মের অনেকের ধারণা, ভারতের একটি রাজনীতি ছিল শরণার্থী প্রবেশের উদার অনুমতি দেয়ার। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, পাকিস্তান যদি নিষ্ঠুরতা না দেখাত ২৫ মার্চের পর, তাহলে এত শরণার্থী দেশ ত্যাগ করত না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনি, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদরদের অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতার ফলে সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ও সমর্থক এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের দেশে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

আমাদের জেনারেশন যা দেখেছে তার ভিত্তিতে একথা। দেখা ও তত্ত্বে অনেক তফাৎ। হ্যা, প্রবল শরণার্থীর ঢেউয়ের কারণে বিশ্ব সিভিল সমাজ বাঙালিদের সমর্থন করেছিল। ভারত বিশ্ব দরবারে শরণার্থীদের কথা বারবার তুলে ধরে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছে। বাস্তুচ্যুতিও কিন্তু গণহত্যা-নির্যাতনের অন্তর্গত। রোহিঙ্গাদের জন্য যে বাংলাদেশ সীমানা খুলে দিয়েছিল তার পেছনে কী রাজনীতি ছিল? বরং ১৯৭১ এর স্মৃতিই রোহিঙ্গাদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেনি। মানস ঘোষের অনুভব- “I realized how true was the belief that leading editors in India lived in ivory towers and had no idea of ground realities.”

কিন্তু, একথা সত্যি এপ্রিল অব্দি। তারপর কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের ১৯৭১ সালের পত্রিকাগুলি দেখেছি, সংকলন ও সম্পাদনা করেছি। পশ্চিমবঙ্গের তিনটি পত্রিকা আনন্দবাজার, যুগান্তর ও কালান্তর মার্চ ২৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, বাংলাপত্রিকার ম্যানেজমেন্ট ছিল বাঙালিদের হাতে। মানস ঘোষ যেমন তার রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছিলেন- ‘ব্রাদার মিটস ব্রাদার’- সে রকম অনুভব তাদের সৃষ্টি হয়েছিল, পাঠকদের কৌতুহল বাড়ছিল। স্টেটসম্যানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এক নয়। বাংলাদেশের জন্য ঐ বয়সে মানস ঘোষের কমিটমেন্ট সৃষ্টি হওয়ার কারণ দুটি- জাতিগত আবেগ ও আদর্শবাদ। শেষোক্তটির জন্য পরবর্তীকালে মানস ঘোষ-কে বাংলা স্টেটসম্যানের সম্পাদক পদ ছাড়তে হয়েছে।

যশোর এর ওপর রিপোর্ট প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। স্টেটসম্যান ভারতের নামী পত্রিকা শুধু নয়, সারা ভারত জুড়ে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল। তাঁর প্রতিবেদন দিল্লিতে ভূপেশ গুপ্ত, সুখময় বাবু ও অবনি লাহিড়ির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁরা জানান মানস বাবু-কে যে, এখন তাঁরা বাংলাদেশ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেলেন ফলে তাদের এখন বাঙালিদের সমর্থন করা সহজ হবে। এ রিপোর্ট পড়ে পরদিন কলকাতা চলে এলেন পিটার হ্যাজেলহার্স্ট। দিল্লির সাউথ ব্লকও নাড়া খেল। মানস ঘোষ লিখেছেন, জেনারেল ম্যানেকশ’র দক্ষিণ হস্ত লে. জেনারেল বি এন সরকার তাঁকে ফোন করলেন, মে মাসে কলকাতায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন, স্টাবলিশমেন্টের অনেক খবরাখবর দিলেন যা পরবর্তীকালে তাঁর রিপোর্টিং কে সহায়তা করেছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, দিল্লিতে দুই বাঙালি ‘কালো’ অশোক মিত্র [প্রধানমন্ত্রীর প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা] ও আই সি এস ‘শাদা’ অশোক মিত্র [সচিব] বাংলাদেশ বিষয়ে ইন্দিরাকে সহায়তা করতেন। আর বি এন সরকার যুদ্ধের কৌশলগত ক্ষেত্র প্রস্তুতে কাজ করতেন। তিনি এ বিষয়ে এত মগ্ন থাকতেন যে দৈনিক ২০ ঘণ্টা কাজ করতেন, অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেন নি। স্ত্রীর মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে সর্বশান্ত করে দিয়েছিল। যুদ্ধের পর তিনি আশ্রয় নেন কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশনে। ১৯৭৯ সালের দিকে গোলপার্কের এই রামকৃষ্ণ মিশনে আমি ছিলাম তিন মাস। তখন দেখেছি, প্রতি বিকেলে পাজামা আর শার্ট ও চটি পড়ে একা তিনি হাটছেন। সন্তের জীবন যাপন করতেন। কারো সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না। মিশনের কিছু শিক্ষার্থীকে বিদেশি ভাষা শেখাতেন।

যশোর রিপোর্টের সাফল্যের পর যখন কর্তৃপক্ষ তাকে ‘সুযোগ’ দিল অবাধ রিপোর্র্টিং-য়ের  তখন প্রতিদিন তিনি চলে যেতেন সীমান্তে, ৩০০/৪০০ মাইল ভ্রমণের পর এসে রিপোর্ট লিখতেন, বি এন সরকারের মতো বাংলাদেশও তার অবসেশন হয়ে উঠছিল। এরপর তিনি দর্শনা হয়ে চুয়াডাঙ্গা গেছেন। মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সঙ্গে থেকেছেন। এখানের একটি ঘটনার কথা তিনি আমাকে বলেছিলেন। আবু ওসমান, আসহাবুল হক এদের সঙ্গে আলাপ করে ফিরবেন, সারাদিন নাওয়া খাওয়া হয়নি। এমন সময় ওসমানের স্ত্রী ভেতর থেকে আবু ওসমানকে বললেন, ছেলেটা সারাদিন খায়নি। ও যেন খেয়ে যায়। এ সামান্য ঘটনা তাঁকে অভিভূত করেছিল। এখনও এ ঘটনা মনে পড়লে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। ১৯৭৫ সালে আবু ওসমানের স্ত্রীকে বিদ্রোহী সৈন্যরা হত্যা করে। কয়েকদিন আগে আবু ওসমান কোভিডে মারা গেছেন।

চুয়াডাঙ্গা যাবার পথে এবং চুয়াডাঙ্গায় তিনি মুক্তিফৌজের প্রাথমিক প্রতিরোধ দেখেছেন, তাঁর প্রতিবেদনে সেগুলি উঠে এসেছে। এখানে শুধু একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। চুয়াডাঙ্গা জেলে খোঁজ পেলেন আটক আছেন পাকিস্তানি লে. আতাউল্লাহ। তিনি বিদেশি রিপোর্টারের কথা শুনে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। মানস ঘোষ গেলেন। আতাউল্লাহর বিধ্বস্ত অবস্থা, মানস ঘোষের হাত ধরে বল্লেন অশ্রুসিক্ত নয়নে, দেশে আমার একটি ছোট মেয়ে আছে নাসিমা, আমার একটি ছবি ছেপে জানাবেন আমি বন্দি। তাহলে আমার খবর পেয়ে তারা হয়ত স্বস্তি পাবে। মানস ঘোষ আতাউল্লাহর ওপর বিশেষ রিপোর্ট করেছিলেন।

স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত কুস্টিয়া সার্কিট হাউজের ছবি।

কলকাতা ফেরার পথে তিনি আসহাবুল হক-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ লড়াই টিকবে তো। আসহাবুর দৃঢ় ভাবে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই’। ইতোমধ্যে তাজউদ্দিন, আমিরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও সোহবার হোসেন সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। আমি তাদের সহায়তা করেছি। তাজউদ্দিনই যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। এ নির্দেশ স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর। তাঁর ভাষায়- বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছেন তার অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দিন-

“would lead the liberation struggle in his name. if he were put behind bars. Tajuddin was some one who inspired confidence on and all for his honesty, integrity, a deep sense of purpose and obove all else, for his organiging ability and academic brilliance.”

ফিরে এসে গোলক মজুমদারকে তিনি জানালেন তাজউদ্দিনের সীমান্ত পেরুবার কথা, গোলক কিছু না বলে ফোনে রেখে দিলেন। পরদিন যুগান্তরের সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত জানালেন তাঁকে যে, তাজউদ্দিন ও আমীরুল ইসলাম শুধু সীমান্ত পেরুন নি, দিল্লি চলে গেছেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে।

[চুয়াডাঙ্গায় তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল পাবনার নুরুল কাদের খানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মানস তার আলোকচিত্রি ও সঙ্গী আরেক রিপোর্টারকে নিয়ে পাবনা যাবেন কিনা। মেজর ওসমান মানা করেছিলেন। কিন্তু মানস ও তার সঙ্গীরা রাজি হলেন। সেই ভ্রমণ, পাবনায় গিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নেয়া তারপর নকশাল পন্থিদের মুখোমুখি হওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা আছে এ গ্রন্থে। এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে। নুরুল কাদের খান সবাইকে পাবনা ত্যাগ করতে বলেন। তারপর তিনি মানস ও তার সঙ্গীদের নিয়ে ছোট নৌকায় পদ্মা পাড়ির পরিকল্পনা নেন। মাঝ দারিয়ায় ঝড় ওঠে। নৌকা ডুবু ডুবু। কোন রকমে ওপর তীরে পৌঁছান। তীরে তাদের দেখে মানুষজন জড়ো হয়। পরে, নুরুল কাদের খান-কে চিনে তারা সবাইকে শুধু আশ্রয় নয়, আপ্যায়নও করেন। পরদিন ভোরে একজন মুক্তিযোদ্ধাসহ মানস ঘোষের দর্শনার দিকে পাঠান নুরুল কাদের খান। পথে মানস ঘোষকে পাঞ্জাবি ভেবে এক গ্রামে মানুষজন আটক করে ফেলে। পরে এক ছাত্র তাঁর পরিচয়পত্র দেখে মানুষজনকে জানায় তিনি কলকাতার সাংবাদিক। পুরো গ্রামবাসী তখন তার আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এখানেই তিনি দেখেন কিশোরী মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল-কে। এসব ঘটনার চমৎকার বিবরণ তিনি দিয়েছেন। এপ্রিল ১০ ও ১১ তারিখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের রিপোর্ট আবার নাড়া দিল। শিরিণের ঘটনা সবাইকে আবেগী করে তুলেছিল। কিছুদিন আগে শিরিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

স্টেটসম্যান পত্রিকার পাতায় শিরিন বানু মিতিল

এভাবে বাংলাদেশ প্রতিরোধের দিকে এগুতে লাগল। মানস ঘোষও সাংবাদিক হিসেবে নীতি নির্ধারক, সাংবাদিক মহল ও সাধারণের মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলেন।

আলমডাঙ্গায় সেই সময়ের ঢাকার খ্যাতনাম তরুণ অভিনেতা জাফর ইকবালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। জাফর নিজেই পরিচিত হয়েছিলেন মানসের সঙ্গে। যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন। কলকাতার মানস জাফরকে সঙ্গে করে নিয়ে তাঁর বাসায় থাকতে দিয়েছিলেন। জাফর সেখানে থাকেন, খান দান কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখান না। দু’সপ্তাহ পর জাফর তাঁর কাছে পাঁচশো টাকা চাইলেন। বিমানে আগরতলা যাবেন, তার মন টিকছে না, তিনি ঢাকা যাবেন তার প্রেমিকা ববিতার কাছে। বিস্মিত হলেন মানস, বললেনও সে কথা। জাফর ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে গেলেন। দু’সপ্তাহ পর পাবনার সেই মুক্তিযোদ্ধা বকুল জাফরের খোঁজে এলেন মানসের কাছে। জানালেন, তাকে ধরে নিয়ে ক্যাম্পে নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সে পাকিস্তানি সেনাদের হয়ে কাজ করছে। তার বোন শাহনাজ রহমতউল্লাহও ‘গাদ্দার’ আখ্যা দিয়েছেন তাকে মানস ঘোষকে। তবে, আমার মনে হয় এটি অতিরঞ্জন। অনেকে সেই সময় সীমান্ত পেরিয়েছেন, আবার ফেরতও গেছেন। তারা সবাই পাকিস্তানিদের হয়ে কাজ করেছেন তাও নয়। মুক্তিযুদ্ধের পরও জাফর ইকবাল সম্পর্কে সে রকম কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি। সে সময়, পত্র-পত্রিকার মতে তিনি প্রেমে পড়েছিলেন ববিতার। অসম্ভব নয় তার টানে ফেরত গিয়েছিলেন।

এপ্রিলে তাজউদ্দিন কী ভাবে গোলক মজুমদারের সহায়তায় দিল্লি গিয়েছিলেন, কী করেছিলেন তার অজানা বিবরণ আছে। তাজউদ্দিন সম্পর্কেও যে ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা সন্দিহান ছিলেন না তা নয়। কিন্তু, চিত্তরঞ্জন সুতার যখন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে জানালেন, তাজউদ্দিনই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত ব্যক্তি তখন আর তাঁর সম্পর্কে সন্দেহ থাকে নি। তাঁর মতে-

“That Tajuddin was, indeed, the seniormost member of the secret government had formed for leading the liberation war in his absence and that he not only enjoyed Mujibs total enfidence but that of entire party, the hitch was reloved.”                            

তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে কারা কাজ করছিলেন তার বিবরণও আছে। কী ভাবে মুজিবনগরে গোলক মজুমদার ও রুস্তমজী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, হোসেন আলীকে কী ভাবে প্রণোদনা যুগিয়েছিলেন বাংলাদেশ সরকারে যোগ দেয়ার তার অজানা বিবরণ আছে। হোসেন আলীও তার কর্মচারিরা বেতনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন। গোলক মজুমদার সে সমস্যারও সমাধান করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার শপথ নেয় ১৭ তারিখ আর হোসেন আলী যোগ দেন ১৮ তারিখ। এটি পাকিস্তান সরকারের জন্য ছিল বড় ধরণের আঘাত। এ ঘটনা অবরুদ্ধ দেশের মানুষজন, শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছিল।

বাংলাদেশ সরকার যেমন সব গুছিয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে সে রকম সরকারের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রও চলছিল। সোভিয়েত কর্মকর্তা গুরগিনোভ মানস ঘোষকে প্রথম জানান আমেরিকান কনসাল জেনারেলের সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকজন সাংসদ দেখা করেছেন। তাদের ইচ্ছা, ঢাকায় ফিরে সামরিক জান্তার সঙ্গে সমঝোতা করা। তবে, এ পরিকল্পনা ভেস্তে নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে চিনারা কী করছিল তাও তুলে ধরেছেন। ইন্দিরা গান্ধী বিভিন্ন দেশে দূত পাঠাচ্ছিলেন বাংলাদেশে কী ঘটছে এবং ভারত কী করছে তা জানাবার জন্য। সৈয়দ শাহাবুদ্দীনকে পাঠানো হয়েছিল পশ্চিম এশিয়ার ‘ইসলামী’ দেশগুলিতে। শাহাবুদ্দীন মানস ঘোষকে বলেছিলেন তিনি তাদের বিষয়টি বোঝাতে পারছিলেন না। একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে সরাসরি বলেছিলেন-

“…most of the refugees are non muslims. you are a Hindu-majority country. So they have come to India. why should you be bothered? we are not bothered about their and your plight.”

শাহাবুদ্দীন তাঁকে আরো বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার প্রতিক্রিয়াও ছিল প্রায় একই রকম।

ঐ আমলের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী আমলা পি এন হাকসার মানস ঘোষকে বলেছিলেন, ৬ মে ইন্দিরা গান্ধী মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সরকারের কার্যাবলী সংহত করার জন্য চারটি প্রস্তাব কার্যকরের কথা বলেছিলেন। এ পরামর্শের মধ্যে একটি ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার প্রতিষ্ঠা। বলার অপেক্ষা রাখে না যুদ্ধের ১১টি সেক্টরের বাইরে এটি ছিল একটি সেক্টর যা যুদ্ধ জয়ে মনোবল দৃঢ় করেছিল। ঐ সময় ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা সম্পর্কেও লেখক আলোচনা করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতীয় মুসলমানদের নিয়েও একটি অধ্যায় আছে এ গ্রন্থে, কেন্দ্রে যেমন ফখরুদ্দীন ছিলেন বিরোধী তেমনি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসী মন্ত্রী সভার দুই মন্ত্রী আবদুস সাত্তার ও জয়নাল আবেদীন ছিলেন বিরোধী। তারা প্রকাশ্যেই বলতেন, ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তান ও মুসলমান বিরোধী। এ সত্ত্বেও তারা মন্ত্রী সভায় কী ভাবে ছিলেন সেটি একটি প্রশ্ন বটে। ইন্ডেপেনডেন্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সৈয়দ বদরুদ্দোজা ও প্রাক্তন মন্ত্রী গোলাম ইয়াজদানীও একই কাজ করছিলেন। সীমান্ত এলাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। সরকার তাদের একসময় গ্রেফতার করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও তাদের ছাড়া হয় নি। পরে, বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তাঁরা মুক্তি পান। এ তথ্য আমাদের জানা ছিল না।

এ প্রসঙ্গে এইচ টি ইমামের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন ঘোষ। পশ্চিম দিনাজপুর দিয়ে তিনি সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন আসন্ন প্রসবা। প্রথম যে পাকা বাড়িটি চোখে পড়ল সেখানে গিয়ে তিনি তার পরিচয় দিয়ে আশ্রয় চাইলেন। গৃহকর্তা মুসলমান, তাঁকে আশ্রয় দিলেন না। পরপর কয়েকটি মুসলমান বাড়িতে আশ্রয় পেলেন না। পরে, এক হিন্দুর গোশালায় আশ্রয় পেলেন। সে রাতে সে গোশালায় তার পুত্রের জন্ম হয়।

অন্যদিকে ভারত সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার মুক্তিবাহিনি তৈরি করেন। এ বাহিনির প্রশিক্ষণে মেজর জেনারেল শাহবেগ সিং ও ব্রিগেডিয়ার সন্ত সিংহের অবদান বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে এ নিয়ে বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনির অফিসারদের বিরূপ মনোভাব ছিল। এর কারণ উল্লেখ করেছেন মানস দে। জেনারেল ওসমানী তাকে বলেছিলেন, ডি পি ধর, পি.এন. হাক সার, লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা এবং লে. জে. জ্যাকব ওসমানী বা বাঙালি অনেক উচ্চ পদস্থদের সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করতেন না। ডি. পি. ধর অ্যাপয়নমেন্ট করার পরও তাদের বসিয়ে রাখতেন। ওসমানীর সঙ্গেও ডি পি ধর একই ব্যবহার করতেন। এ সম্পর্কে শুরুতেই লিখেছি তাই পুনরুল্লেখ করলাম না। মানস ঘোষ লিখেছেন, রায়গঞ্জ, চাকুলিয়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের সেনা অফিসারদের ভারতীয় প্রশিক্ষক বিরোধী মন্তব্য শুনেছেন। তিনি যখন তাদের বলেছেন, তারা কেনো প্রশিক্ষণ করাচ্ছেন না? তখন তারা বলেছেন, তাদের সে সময় নেই। আর এগুলি করলে মুক্তিবাহিনির নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধ করবে কে? এ প্রসঙ্গে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী কামরুজ্জামানকে বললে তিনি বলেছিলেন, তরুণ অফিসাররা পাকিস্তানি মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরপরও এ ধারা বলবৎ ছিল যার ফলে শহীদ হতে হলো সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে, জিয়া-এরশাদ-খালেদা বাংলাদেশকে শাসন করে গেলেন তিন দশক।

খোন্দকার মোশতাক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের তাজউদ্দিন বিরোধিতা ও ষড়াযন্ত্রের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক মোশতাক। বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক প্রচারিত পোস্টার [আমরা বাঙালি]-এর সমালোচনা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে ধর্মনিরপেক্ষতাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলতেন তোমরা মোসলমান, আল্লার দোহাই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা তুলো না। শুধু আল্লাহ আল্লাহ করো।

এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দিনের কথা বলতে হয়। নানা রাজনৈতিক কারণে আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি প্রায় অনুচ্চারিত থেকে গেলেন। তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথা ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা জানতেন। তাদের একজন ঘোষ-কে বলেছিলেন, এ সময় [১৯৭১] আওয়ামী লীগে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো তাজউদ্দিন ছাড়া আর কেউ নেই।

মুক্তিবাহিনি লড়াই করছে, মুজিবনগর সরকার এ অর্ন্তদ্বন্ধ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, সাধারণভাবে মানুষ হতাশ, চিন আমেরিকা প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করছে। আগস্ট এর দিকে গেরিলা তৎপরতা বেড়ে গেল। এ তৎপরতা পর্যবেক্ষণে মানস ঘোষ ১৪ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রাজশাহীর সারদায় যাচ্ছিলেন পুলিশ একাডেমি আক্রমণে। তারা সেখানে হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনির আক্রমণের সম্মুখীন হন। জীবন মরণ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটেন। বিএসএফের গানবোট তাদের উদ্ধার করে। আবারও মানস ঘোষ বেঁচে যান সোভিয়েত ভারত মৈত্রী চুক্তি হলে ভারতের অবস্থান শক্ত হয়। ইন্দিরা ভারতের জনসাধারণের সম্পূর্ণ সমর্থন লাভ করেন। এবং ইন্দিরা তাঁর নীতি বাস্তবায়ণে দৃঢ় পদক্ষেপ নেন। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে। এর পরের ইতিহাস সবার জানা।

মানস ঘোষ গ্রন্থের সর্বশেষ অধ্যায়ে [২৪] আফশোসের কথা লিখেছেন। ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজির আত্মসমর্পণে তিনি থাকতে পারলেন না। কারণ তিনি ‘embedded journalist’ হিসেবে জেনারেল দলবীর সিংহের বাহিনির সঙ্গে খুলনা অভিমুখে ছুটছিলেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে লড়ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত। ইতোমধ্যে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। দেখা গেল হঠাৎ শান্তির সাদা পতাকা উড়িয়ে হায়াত দলবীরের ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা হয়েছেন। দুজনই বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনিতে ব্যাচমেট ছিলেন।  আত্মসমর্পণের পর দুজনের কোলাকুলি আর থামেনা। পাকিস্তানিদের জন্য স্পেশাল বিরিয়ানি করা হলো। ঠান্ডা বিয়ার আনা হলো। তারা আনন্দের সঙ্গে বিয়ার পান করতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে মানস জিজ্ঞেস করেছিলেন হায়াতকে “what was the last five days fight for? Why did you fight so hard and to what purpose?”

হায়াত উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমাকে নয়, নিয়াজি আর প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করুন’। এর ওপর মানস তাঁর শেষ রিপোর্টটি করেন যা খুবই প্রশংসিত হয়েছিল। নানপোরিয়া মানস ঘোষকে পুরষ্কৃত করেছিলেন। তাঁকে প্রমোশন দিয়ে ঢাকার ব্যুরো চিফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি মানস-কে বলেছিলেন এতোদিন মৃত্যু আর ধ্বংসের রিপোর্ট করেছো। এখন একটি নতুন দেশ কী ভাবে গড়ে উঠছে তার রিপোর্ট করো।

মানস ঘোষের গ্রন্থটি একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত  ইতিহাস, অন্যদিকে ১৯৭১-এ তাঁর স্মৃতি কাহিনি। দুটির মিশেলে গড়ে ওঠা এই narrative এর বৈশিষ্ট্য, অনেক ছোট ছোট ঘটনা, তথ্যের সমাবেশ। অন্যদিকে, একজন তরুণ রিপোর্টার কী ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন কর্মের মাধ্যমে তারও বিবরণ। একজন রিপোর্টারকে উন্নতমানের রিপোর্ট করতে হলে বিশেষ করে এ পরিস্থিতি থাকতে হয় যে গুণের তা’হলো কমিটমেন্ট বা বিশ্বাস। মানস উপসংহারে লিখেছেন শেষের দিকে অতি দ্রুত যত নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে তার জন্য অনেকে, এমনকী তিনিও সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।–

“Even I was overcome with an overpowering sense of fulfillment; it was as if I had realized a goal that I had set out to achive on 27 March, when I first went to Petrapole border to report on the liberation war and decided to stand by the defenseless, persecuted and haplen Bangalis.”

অন্যদিকে, হচ্ছে অনুসন্ধিৎসু মন ও ঝুঁকি নেয়ার সাহস। মানস ঘোষ বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করেছেন এবং বাঙালিদের পক্ষে শুধু নয়মাস নয়, আজও দৃঢ় অবস্থানের কারণ মুক্তিযুদ্ধে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতি গঠনের আদর্শ। সে জন্য এ আদর্শ থেকে বাঙালি বিচ্যুত হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। লেখেন, আবার যখন লাইনচ্যুত ট্রেন লাইনে ফেরে তখন এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। তাঁর নেয়া শেখ হাসিনার অনেক সাক্ষাৎকার এর প্রমাণ। এ প্রসঙ্গে গ্রন্থের গদ্যের কথা বলতে হয়। আমরা বাঙালিরা যখন ইংরেজি লিখি তখন প্রায় ক্ষেত্রে তাতে করণিক ইংরেজির প্রভাব থাকে। মানস ঘোষের গদ্য সে প্রভাবমুক্ত। স্বাদু গদ্যে লেখা, বর্ণনার ধারার মধ্যে ঝড়ে পড়ে। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে তার যে রোমান্সের শুরু হয়েছিল তা এখনও অটুট । এর প্রমাণ মুজিববর্ষে, বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে, মুক্তিসন ৫০-এ তাঁর লেখা এ গ্রন্থ।

দি টাইমস-এর বিখ্যাত সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত মানস ঘোষের প্রতিবেদনগুলি পড়ে স্টেটসম্যানের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সি আর ইরাণি-কে লিখেছিলেন- “Your Manash Ghosh has become a Journalist turned Muktijoddha.”

কথাটি সত্য। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা এখনও সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র, মুক্তিযুদ্ধ এখনও আবেগময় করে তোলে মানুষকে- আর এ কারণেই মানস ঘোষকে আমরা আমাদের লোক, মুক্তিযোদ্ধা মনে করি। ঠাট্টা করে বলি মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে ঘটি থেকে বাঙাল-এ রূপান্তরিত করেছে।

১৯৭২-৭৫-এ মানস ঘোষ ঢাকায় ছিলেন। এ সময়টুকু বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনা বহুল সময়। সুতরাং আমরা আশা করতে পারি বর্তমান গ্রন্থের পরিপূরক হিসেবে তিনি ঐ সময়কাল নিয়ে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করবেন। শুধু তাই নয় ইতিহাসের স্বার্থে ১৯৭০-৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে একটি সংকলনও প্রকাশিত হবে। যিনি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করলেন, একটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষী হলেন তার জন্য এটি নেহাতই তুচ্ছ কাজ। কিন্তু আমাদের জন্য তা হবে অসামান্য পাওয়া।

জয় বাংলা! জয় মানস ঘোষ!

মানস ঘোষ
  • আলোচ্য প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে মানস ঘোষের রচিত গ্রন্থ Bangladesh War: Report from Ground Zero এর মুখবন্ধ থেকে। মুখবন্ধটি লিখেছেন মুনতাসীর মামুন, বঙ্গবন্ধু চেয়ার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Post a comment