Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

রক্ত দিয়ে লেখা ইতিহাস, ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরর

‘নদীতে লাশ আর রক্তের স্রোত দেখেছি। যে স্রোতে ভেসে ছিল অগণিত লাশ। কোথাও পা রাখার জায়গা নেই। নদীর পাশ দিয়েও অনেক লাশ, নদীতেও লাশ। রক্তে চারদিক লাল হয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ অনেকেই তখনো বেঁচে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসহায়ভাবে। ওইদিন আমাকে ঘটনাস্থলের একটি মসজিদের বারান্দায় বাড়ির পাশের এক নারী পাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। আমি পাটির ফাঁক দিয়ে দেখেছি, পাকিস্তানিরা কীভাবে একে একে গুলি করে মানুষ হত্যা করে। এই গণহত্যার পাশাপাশি বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী নারীদের ধর্ষণ করে।’ বলছিলেন খুলনার চুকনগর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী নিতাই গায়েন।

মুক্তিযুদ্ধ মানে রণাঙ্গনের যুদ্ধ শুধু নয়। জাতির গৌরবময় এ অর্জনের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে রয়েছে আত্মাহুতি আর নৃশংসতারও করুণ ইতিহাস। গণহত্যার বর্বর ইতিহাস। কোটি মানুষের আহাজারি, নারীর ত্যাগ আর মৃত্যু। নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার পণ। আর নিরস্ত্র বাঙালির কাছে মৃত্যুই যেন শক্তি। মুক্তিযুদ্ধে বর্বর গণহত্যার এমনি সব ঘটনার স্মৃতিকে ধরে রাখছে খুলনার ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। মুক্তিযুদ্ধে ভয়াবহতম গণহত্যা ঘটেছিল চুকনগরে। দিনটি ছিল ২০ মে। ১৯৭১ সালে খুলনার চুকনগরে সবচেয়ে বড় ও নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। সে কারণেই গণহত্যা জাদুঘরটি খুলনায় স্থাপন করা হয়েছে।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটি শুধু চারটি বর্ণের সমাহার নয়, এর পেছনে আছে লাখো মানুষের দুঃখ-বেদনা, অশ্রু, রক্ত, ক্ষোভ, নির্যাতন আর অপমান এবং অবশ্যই অসম সাহসী লড়াইয়ের উপাখ্যানও জড়িয়ে রয়েছে। এই ইতিহাস জেনে ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন সত্য অনুধাবন ও রক্ষার পাশাপাশি একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে সে লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে এ জাদুঘর।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান, তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রীর উদ্দেশে সেই বিখ্যাত উক্তি ‘জোহুরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেয়ো।’ সেইসব ইতিহাসের টুকরো টুকরো স্মৃতি পরম মমতায় ঝুলছে খুলনার ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ এর দেওয়ালে। সে ইতিহাস রক্ত দিয়ে লেখা।

‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’ এর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের প্রস্তাবে সম্মিলনীর উদ্যোগে গড়ে ওঠে আর্কাইভটি। এর উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা-নির্যাতন, বধ্যভূমি, গণকবর সংক্রান্ত তথ্যভা-ার গড়ে তোলা, এর বিশদ বিবরণ তৈরি, গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত করা, প্রদর্শনী, প্রকাশনা প্রভৃতি।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন সেকান্দার আলী সেরনিয়াবাত এর তিন সন্তান। স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে সেকান্দার আলীকে তিন হাজার টাকার চেক প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শহিদ তিন সন্তানের শেষ স্মৃতি হিসেবে সে চেকের টাকা আর উত্তোলন করেননি সেকান্দার। প্রায় পাঁচ দশক ধরে আগলে রেখেছেন সেই স্মৃতি। সেটি এখন খুলনার জাদুঘরে।

২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনা মহানগরীর ময়লাপোতা মোড়ের একটি ভাড়া বাড়িতে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৫ সালের আগস্টে নগরীর ২৬ নম্বর সাউথ সেন্ট্রাল রোডে একটি দোতলা বাড়ি বরাদ্দ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সেটি সংস্কার করে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সেখানে স্থানান্তর করা হয় আর্কাইভ ও জাদুঘরটি।

মাত্র চার বছরের মধ্যেই আর্কাইভে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নির্মমতার ওপর প্রচুর আলোকচিত্র। আছে গণহত্যা বিষয়ক তথ্য। ইতোমধ্যে খুলনা বিভাগের ২০টি বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। এই আর্কাইভে আছে বধ্যভূমি সংক্রান্ত তথ্যভা-ার।

রক্ত দিয়ে লেখা ইতিহাস

বাড়িটির গেট পেরোলেই দোতলা একটি পুরাতন ভবন। নিচতলায় ডান পাশের কক্ষটির দেওয়ালে টাঙ্গানো মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ছবি। আর বাম পাশের কক্ষটির নাম শহিদ গ্যালারি, সেখানে রয়েছে বটিয়াঘাটা উপজেলার বাদামতলা গণহত্যায় শহিদ মাধবচন্দ্র বৈরাগীর ধূতি ও সৌরভী গোলদারের রক্তমাখা কাপড় ও টাকা, নগরীর খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের যেখানে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হতো সেই বয়লারের ছবিসহ গণহত্যার নানা নিদর্শন। মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও নির্যাতনের এমন অসংখ্য নিদর্শন স্থান পেয়েছে এই ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ এ। দেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। গণহত্যা-নির্যাতনের আলোকচিত্র, চিত্রকর্ম ও বই সংগ্রহের পাশাপাশি স্মৃতিফলক স্থাপন এবং বিভিন্ন প্রকাশনা তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আর্কাইভের ১০টি কক্ষের দেওয়ালে সাজানো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতন ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের তিনশ’রও বেশি আলোকচিত্র। রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার চিঠি, গণহত্যায় নিহত বা নিখোঁজদের খোঁজ জানার জন্য অনেকেই তখন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখতেন। এরকম চিঠির খাম। গণহত্যাবিষয়ক অসংখ্য বই, ম্যাগাজিন, স্মরণিকা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের কপি। গণহত্যার চিত্রকর্ম, খুলনায় মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত টেলিফোন সেট, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রেডিও, শহিদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের ডায়েরি, দৈনিক ইত্তেফাকের ততকালীন কার্যনির্বাহী স¤পাদক শহিদ সিরাজউদ্দিন হোসেনের পাঞ্জাবি, শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের শাড়ি ও কলম, শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি, শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বিবিসির সংবাদদাতা শহিদ নিজাম উদ্দিন আহমদের কোট, দুর্লভ ডাক টিকিট এবং শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বইয়ের পা-ুলিপি ও জিনিসপত্র স্থান পেয়েছে আর্কাইভে। মুক্তিযুদ্ধের বই বিক্রির জন্য জাদুঘরে একটি বিক্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য একটি ক্যাফেটেরিয়া ।

বঙ্গবন্ধুর চিঠি

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশের জন্য একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিটি এখন খুলনার জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। চিঠিতে লেখা রয়েছে বাংলা দেশের সাত কোটি মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্যে আমাদের আজকের এই সংগ্রাম। অধিকার বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। বুলেট বন্দুক বেয়নেট দিয়ে বাংলা দেশের মানুষকে আর স্তব্ধ করা যাবে না। কেননা জনতা আজ ঐক্যবদ্ধ। লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দুর্গ। আমাদের দাবী ন্যায়সঙ্গত। তাই সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন দৃঢ়তর করার অন্যতম প্রচেষ্টা হিসেবে সংবাপদপত্র সমূহের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগকে আমি অভিনন্দন জানাই। জয় বাংলা।

তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি

গণহত্যা জাদুঘরে আরো আছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্ত্রীকে লেখা তাজউদ্দীন আহমেদের চিঠি ও বঙ্গবন্ধুকে হুমকি দেওয়া চিঠি। তাজউদ্দীন চিঠিতে লিখেছেন, ‘জোহুরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেয়ো।’ একাত্তরের উত্তাল-অস্থির সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ প্রিয়তমা স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে করণীয় স¤পর্কে ওই চিঠিতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। মাত্র দুই লাইনে সে সময়ের জনপ্রিয় বকমার্কা সিগারেট এর প্যাকেটের গায়ে লেখেন এই চিঠি।

চিঠিটি এতোদিন সংরক্ষণ করা ছিল ‘আর্কাইভ ৭১’ এর নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক প্রণব সাহার কাছে। গত ৫ মার্চ তার পক্ষ থেকে সেই চিঠি হস্তান্তর করা হয় ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ কর্তৃপক্ষের কাছে। শুধু এই চিঠিটিই নয়; একাত্তরের গণহত্যার আরও নানা স্মৃতিবহ স্মারক তিনি হস্তান্তর করেছেন জাদুঘরে।

যেভাবে পরিচালিত হয় জাদুঘর

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ট্রাস্টের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন। ট্রাস্টি স¤পাদক হিসাবে রয়েছেন বিএমএ’র সহ-সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম। এছাড়া জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসাবে আছেন প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান, শাহরিয়ার কবির, তারিক সুজাত, শংকর কুমার মল্লিক, চৌধুরী শহীদ কাদের, আবুল কালাম আজাদ ও হুমায়ুন কবির। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র এই গণহত্যা জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো.আব্দুল্লাহ আল শরীয়তউল্লাহ কাজল।

আর্কাইভের স¤পাদক ডা. শেখ বাহারুল আলম জানান, শুধু জাদুঘরেই সীমাবদ্ধ নেই এর কর্মকা-। খুলনা সার্কিট হাউজ সংলগ্ন হেলিপ্যাড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, খালিশপুর মুন্সীবাড়ি, আনসার ক্যা¤পসহ ২০টি এলাকার গণহত্যা স্থলে এ প্রতিষ্ঠানটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছে। এর মধ্যে খুলনায় রয়েছে ৯টি, বাকিগুলো খুলনার বাইরে। আর্কাইভের পক্ষ থেকে গণহত্যার ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনী করা হয়েছে জাতীয় জাদুঘর, ভারতের ত্রিপুরা ও খুলনায়। গণহত্যার ওপর বই প্রকাশ করা হয়েছে ৩১টি, কাজ চলছে আরও ২০টির। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘আর্কাইভ বার্তা’ প্রকাশ করা হচ্ছে নিয়মিত।

তবে আর্থিক সংকট ও জরাজীর্ণ ভবনসহ বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। তারপরও এটিকে আন্তর্জাতিক মানের গণহত্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে উদ্যোক্তাদের।

জাদুঘরে প্রবেশে টিকিটের মূল্য মাত্র ২টাকা। সোমবার সারাদিন বন্ধ থাকে এটি। শুক্রবার খোলা থাকে দুপুর ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। সপ্তাহের অন্য ৫ দিন বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘর।

দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ই মার্চ ২০১৮

Post a comment