৩০ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান হল মিলনায়তনে ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপের ফলাফল সংক্রান্ত প্রকাশিত ১০টি গ্রন্থ নিয়ে দিনব্যাপী জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী এই সেমিনারের তিনটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির ও অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। উদ্বোধনী অধিবেশনে ১০ টি জেলার গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ নিয়ে ১০ টি গ্রন্থ, গণহত্যা ও গণকবর নিয়ে লেখা নির্ঘন্ট গ্রন্থমালার ৫০তম গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি ও উদ্বোধক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, সভাপতি হিসাবে ছিলেন ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের ট্রাস্টিজ এবং লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির এবং সূচনা বক্তব্য রাখেন ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন,‘সম্প্রতি মিয়ানমারের গণহত্যাকে আন্তার্জাতিভাবে অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশের গণহত্যার কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা ছিল আরও ভয়াবহ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাদ দিয়ে সংস্কৃতিচর্চা হতে পারে না, বলে মন্তব্য করেন।’ তিনি আরও বলেন,‘গণহত্যা-গণকবর নিয়ে কাজ করাটা কতটা প্রয়োজনীয়, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই কাজ দেশের প্রতিটি স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে।’

ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘গণহত্যায় সরকার যে হিসাব দেয় সেটিই সারা বিশ^ মেনে নেয়। বাংলাদেশ সরকার বলেছে, গণহত্যায় ৩০ লক্ষ নিহত হয়েছিল আমরা সেটি মেনে নিয়েছি। গণহত্যা বিতর্ক শুরু হতে পেরেছে তার কারণ গণহত্যাকে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রে রাখা হয়নি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মূল বৈশিষ্ট গণহত্যা-নির্যাতন। এ কারণে আমরা কিছু কাজ শুরু করি। প্রথমেই খুলনায় আমরা দেশের প্রথম গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করি। গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশ করি।

এ পর্যন্ত ৫০ নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশিত হয়েছে, এই ৫০টি গণহত্যার সিংহভাগের নামই আপনারা অনেকেই শোনেন নি। এরপর মনে হয়, ৬৪ জেলায় গণহত্যা গণকবর বধ্যভূমি ও নির্যতন কেন্দ্র সম্পর্কে জরিপ চালালে কেমন হয় ? প্রথমবারের মত ৪৭ বছর পর গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর নিয়ে জরিপ শুরু করি। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলায় এই জরিপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দেশের প্রতিটি জেলায় এই জরিপ চালানো হবে। গণহত্যা নিয়ে ২শ’ থেকে ৩শ’ বই বের করতে পারলে আমার মনে হয় গণহত্যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।’ তিনি আরো বলেন ১০ টি জেলায় আমরা ২১০৭টি গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর খুজে পেয়েছি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কোষ : ২য় খন্ডে ৯০৫টি গণহত্যা বধ্যভূমি গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্রের নাম রয়েছে। তাহলে ৬৪ জেলায় সে সংখ্যা কত দাঁড়াতে পারে ?’

শাহরিয়ার কবির বলেন,‘ইতিহাস বিকৃতি রোধে এখনও আইন হয়নি। দীর্ঘদিন ধওে আমরা তা দাবি করে আসলেও তার কোন প্রতিফলন ঘটছে না। দ্রুত ইতিহাস বিকৃতি রোধে আইন করা হোক।’ তিনি ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ সম্পর্কে বলেন,‘এ ধরনের গবেষণার পুস্তক দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি উদ্যোগে পৌঁছাতে হবে। তাহলেই এদেশে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনায় বিশ^াসী তরুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে।’

প্রথম অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও শিল্পী হাশেম খান, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান। প্রথম অধিবেশনে গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপের প্রকাশিত ১০টি গ্রন্থের মধ্যে ৫টি গ্রন্থের লেখক আহম্মেদ শরীফ নীলফামারি ও বগুড়া জেলা, সুমা কর্মকার নাটোর জেলা, রেহানা পারভীন ভোলা জেলা ও অমল কুমার গাইন খুলনা জেলার জরিপের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘মুনতাসীর মামুন তার এই সব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তার মত কিছু নতুন নতুন গবেষক তৈরি করে যাচ্ছেন।’

২য় অধিবেশনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লে. কর্ণেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক ও কবি আসাদ মান্নান, বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। এই অধিবেশনে বাকি ৫ জন লেখক রীতা ভৌমিক নারায়ণগঞ্জ জেলা, অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান রাজশাহী জেলা, মো. রোকনুজ্জামান বাবুল পাবনা জেলা, ফাহিমা খাতুন সাতক্ষীরা জেলা ও আক্তার বানু কুড়িগ্রাম জেলার জরিপের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

বিকাল ৪ টায় ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুনের সমাপনি বক্তব্যের মধ্যদিয়ে দিনব্যাপী সেমিনারের তিনটি অধিবেশন শেষ হয়। এই সেমিনারের সহযোগিতায় ছিলেন, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী।

© Genocide Museum Bd | All Rights Reserved | Developed by M Dot Media