গণহত্যা শব্দটির একটি বহুমাত্রিক অর্থ রয়েছে। এর একটি হলো শাব্দিক অর্থ, একটি হলো পারসেপশনাল বা ধারণাগত অর্থ এবং আরেকটি হলো ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বা আইনগত অর্থ। ‘জন’ বলতে যেমন এক বা একাধিক মানুষ বোঝা যায় তেমনি ‘গণ’ বলতে বহু সংখ্যক মানুষসহ একটি শ্রেণি, সম্প্রদায় তথা সমষ্টিকে বোঝায়। আর এই বহু সংখ্যক মানুষকে হত্যা বা পরিকল্পিত হত্যাকে Perception অর্থে গণহত্যা বলা হলেও আইনগতভাবে সেটা তখনই গণহত্যা বলে বিশেষিত হবে যখন কোন জাতি, গোষ্ঠী, গোত্র, সম্প্রদায় বা বিশেষ ধর্মাবলম্বীকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রমাণ নিশ্চিত করা যাবে।

 

জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছিলো। কারণ এই কনভেনশনে দেখানো হয়েছে, গণহত্যা এমন এক কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়। এছাড়া ১৯৪৮ সালে ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত ২৬০(৩) রেজুলেশন এর অনুচ্ছেদ-২ এর অধীনে গণহত্যার যে সংজ্ঞায়িত করা হল তাতেও প্রমাণ হয় বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছিলো।

 

মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রধানতম বৈশিষ্ট্য গণহত্যা-নির্যাতন। পৃথিবীতে এমন কোন যুদ্ধ নেই যেখানে গণহত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রাচীন আমল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যার বিষয় সীমাবদ্ধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে। এবং এটাও বলা হয়েছে যে হত্যা শুধুমাত্র যুদ্ধে ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রাচীন কোন ধর্মগ্রন্থেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ বা বেসামরিক লোক, নারী বা শিশুকে হত্যা বা নির্যাতনের আদেশ দেয়া হয় নি, বরঞ্চ নারী ও শিশু হত্যায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। রামায়ণ, মহাভারত ও ইলিয়ড-ওডিসির সময়ের যুদ্ধ থেকে নেপোলিয়ান পর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিল দুই দলের বিবাদমান সৈন্যের ভেতর। যদিও বাস্তবে এর প্রতিফলন সামান্যই হয়েছে। অবশ্য, প্রাচীন মহাকাব্যসমূহতেও গণহত্যার আলামত পাওয়া যায়। মধ্যযুগ বা আধুনিক যুগে এসে গণহত্যার মাত্রা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক যুগে আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রের উদ্ভাবন পৃথিবীব্যাপী নিত্য-নতুন উপায়ে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করছে। এই তীব্রতা এত বেশি যে, বিশ শতকের মাঝবরাবর ‘জেনোসাইড’ বা ‘গণহত্যা’ নামক একটি নতুন শব্দ আমদানি করতে হয়। কেউ কেউ তখন বলেছিলেন, শব্দ নতুন হলেও অপরাধ পুরনো, আবার চার্চিলের মতো অনেকেই বলেছিলেন যে, পৃথিবী একটি নামহীন অপরাধের কবলে পড়েছে। মধ্যযুগে মঙ্গোলরা কিংবা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে ইউরোপীয় শক্তি ব্যাপকহারে গণহত্যা, নির্যাতন ও জনপদ ধ্বংস করেছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের চেয়ে বেশি নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নিরস্ত্র নিরীহ জনসাধারণ। গত শতাব্দীতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও পঞ্চাশের বেশি ছোট বড় যুদ্ধ হয়েছে দুই দেশের ভেতর কিংবা গৃহযুদ্ধ হয়েছে, যার সিংহভাগ শিকার নিরস্ত্র মানুষ।

 

আধুনিককালে  বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই আর্মেনিয়াতে গণহত্যার ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলে হিটলারের নাৎসী বাহিনী ইউরোপে ইহুদিদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। এছাড়াও, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, বসনিয়া, মিয়ানমার, সুদান, নাইজেরিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা সংঘটিত হয়; প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক শহিদ হয়েছিলেন বলে সাধারণ হিসেবে বলা হয়।

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। অপারেশন সার্চলাইট নাম দিয়ে এই গণহত্যা শুরু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হলেও, এর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় আরো পূর্ব থেকে। এই পরিকল্পিত গণহত্যায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী, পুরুষ, শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দুই লক্ষের অধিক নারী পাকিস্তানিদের পাশবিক শিকারে পরিণত হন। বর্তমানে গবেষকরা ধর্ষিত নারীর সংখ্যা চার লক্ষ বলে মনে করেন। এই গণহত্যায় কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নয়- তাদের সহযোগী রাজাকার, শান্তি কমিটি, আলবদর এবং আলশামস বাহিনীও ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বস্তুত, তাদের সাহায্যের কারণেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এত অল্প সময়ে এত ভয়াবহ মাত্রায় গণহত্যা চালাতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে আলবদর বাহিনী সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।

 

নির্বিচারে গণহত্যার ভেতরে ক্ষেত্রবিশেষে অগ্রাধিকারেরও একটি বিষয় ছিল। পাকিস্তানিরা তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল- ১. আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের, ২. কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের , ৩. মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহযোগীদের , ৪. নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায়কে এবং ৫. ছাত্র ও বুদ্ধিজীবিদের। তবে সব সময় যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়েছিল, তা নয়। প্রথম দিকে এবং পরে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। তারপর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে এনে হত্যা করা হয়েছে।

 

নির্যাতনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈন্যরা গ্রহণ করত তা হচ্ছে- ১. অশ্লীল ভাষায় গালাগালি, তৎসঙ্গে চামড়া ফেটে না বেরুনো পর্যন্ত শারিরীক প্রহার, ২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা, তৎসঙ্গে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রহার, ৩. উলঙ্গ করে ঘন্টার পর ঘন্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা, ৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাকা দেয়া, ৫. হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভেতর মোটা সূঁচ ঢুকিয়ে দেয়া, ৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভেতর মোটা সূঁচ ঢুকিয়ে দেয়া, ৬. মলদ্বারের ভিতর সিগারেটের আগুনে সেঁকা দেয়া এবং বরফখণ্ড ঢুকিয়ে দেয়া, ৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা, ৮ দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বার বার ডোবানো, ৯. হাত-পা বেঁধে রাস্তায় উপরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা, ১০ রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়া, ১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের স্ল্যাবের ওপর ফেলে রাখা, ১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, ১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেয়া, ১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর চড়া আলোর বাল্ব জ্বেলে ঘুমোতে না দেয়া, ১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ পদ্ধতি।

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবেই সারা দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করেছে, তাদের বাড়িঘর, দোকান, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে ধ্বংস করেছে। টাকা-পয়সা, গহনা, অস্থাবর সম্পত্তি লুট করেছে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। আবার কোথাও ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। কোন কোন অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণেও বাধ্য করেছে। কোথাও কোথাও গণধর্মান্তকরন ঘটেছিল। কেবল হিন্দু নয়- পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা বৌদ্ধ খ্রিষ্টান এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষসহ ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডের সবধরণের মানুষকে হত্যা করেছে। তবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ষোভ থাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। একটি রিপোর্ট এ বলা হয়: During the war, the religious minority Hindu community were principal targets of the brutalities of the Pakistan army and their local allies such as the Razakar and Al-Badar paramilitary forces and other collaborators. Even after independence, the Hindu community had to face unfavorable socio-political climate and were victimized by communal elements. As a result, many Hindu families who suffered immense physical and material loses in 1971, have left the country in recent years.

 

বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর ক্রোধ ছিল, সেই ক্রোধের পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রাক্বালে তারা এও বুঝতে পেরেছিল যে, যে কোন জাতির বিবেককে জাগ্রত করার জন্যে যেমন প্রয়োজন বুদ্ধিজীবীর, তেমনি জাতিকে নির্জীব করার জন্যে প্রয়োজন বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেয়া। তাই, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেজর রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে আলবদরের সক্রিয় সহযোগীতায় বুদ্ধিজীবী নিধনে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যদি বাঙালিরা যুদ্ধে জিতেও যায় তবে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেটাও ছিল তাদের বুদ্ধিজীবী নিধনের অন্যতম উদ্দেশ্য। গ্রেফতারকৃত এক আলবদর সদস্য দাবি করেছিল আরো কিছু দিন সময় পেলে সকল বুদ্ধিজীবীদেরকেই হত্যা করে ফেলা হত।

 

১৬ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই গণহত্যার অবসান ঘটে।

© Genocide Museum Bd | All Rights Reserved | Developed by M Dot Media