Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

২৫ মার্চ কেন গণহত্যা দিবস?।। মুনতাসীর মামুন

  • মুনতাসীর মামুন

এ বছর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। গত ২৫ বছর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এ দিনটি পালন করে আসছে কালরাত্রি বা গণহত্যা দিবস হিসেবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে শহীদ মিনারে গণহত্যা দিবস পালনের সূচনা করা হয়। তারপর আলোর মিছিল জগন্নাথ হল বধ্যভূমিতে গিয়ে শেষ হয়। ২৫ মার্চ পালন ছাড়া বিভিন্ন আলোচনা সভায় আমরা গণহত্যা নির্যাতন প্রসঙ্গ এনেছি, এর ওপর গুরুত্ব আরোপের কথা বলেছি। নির্মূল কমিটির পক্ষে শাহরিয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

গত ২৫ বছর এই দিন যাপনে বিএনপি-জামায়াত বাদে সব দলের নেতা, নীতিনির্ধারক, মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি। সরকারি দলের যারা নীতিনির্ধারক বা মন্ত্রী তাদের অনেকেই এসেছেন কিন্তু সরকার থেকে আমরা কোনো সাড়া পাইনি। সংবিধান দিবসও নির্মূল কমিটি নিয়ত পালন করে। কিন্তু সরকার এটি নিয়েও মাথা ঘামায়নি। ১ ডিসেম্বর (বিজয়ের মাস যেহেতু) আমরা বলেছি, মুক্তিযোদ্ধা দিবস পালনে। সেটিতেও নীতি নির্ধারকরা সাড়া দেননি। আসলে নীতি নির্ধারক বা সরকার যে এ দিবসগুলো পালন করতে চান না জাতীয়ভাবে তা নয়। আসলে কেউ বিষয়গুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে সংসদ বা মন্ত্রিসভায় আলোচনা করেননি। গত ২৫ বছর তারা আমাদের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন, ফিরে গেছেন, ফেরার পথে মন থেকে তা মুছে গেছে।

গণহত্যা দিবস পালনে আমরা কেন গুরুত্ব দিয়েছিলাম? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় আমরা দেখেছি, এটিতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আমরা গুরুত্ব দিয়েছি এ কারণে যে, গণহত্যা-নির্যাতন উল্লিখিত না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থাকে না। আমরা জয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় এই ভারসাম্য না থাকায় জাতির পলিটিতে বিষয়টি খেলে যায়নি। উদাহরণ হিসেবে বলি, ভাষা আন্দোলন বা ২১ ফেব্রুয়ারির কথা কেন মুক্তিযুদ্ধ বা গণহত্যা বেশি জানে, এমন কি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌখিক পরীক্ষা নিতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের নেতা, ১৯৭১ সালের সরকার, গণহত্যা সম্পর্কে ধারণা অস্পষ্ট। কয়েকদিন আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আনকোরা নতুন কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তারা শুনেছেন, জানেন, আমি ঢাকা নিয়ে লেখালেখি করি, ঢাকা শহরে নিয়ে তাদের আগ্রহ আছে, তাই দেখা করতে আসা। আমি গণহত্যা-নির্যাতন, (নারী ধর্ষণসহ) সম্পর্কে জানতে চাইলাম, দেখি মোটামুটি তারা কিছুই জানেন না। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন আমার মনে হলো, এ রকমটি এখানে হলো, ইউরোপে হলো না কেন?

এর প্রধান কারণ, পরম্পরা। ইউরোপে নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট সরকার যে গণহত্যা চালিয়েছিল তা কেন মনে রাখে বা রাজনীতিতে কেন প্রভাব ফেলেছে। ইউরোপে হিটলার মুসোলিনির পরাজয়ের পর তারা বিজয় পালন করেছে, এখনো করে কিন্তু গুরুত্ব দিয়েছে গণহত্যা-নির্যাতনের ওপর। শহীদ স্মৃতি পালনের ওপর। কেননা বিজয়ের কথা মানুষ বেশি মনে রাখে না কিন্তু হত্যা-নির্যাতন অপমানের কথা মনে রাখে। তা বংশ পরম্পরায় রক্তের মধ্যে প্রবাহিত হয়। সেই থেকে ইউরোপে আজ পর্যন্ত অজস্র চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, উপন্যাস, গল্প, কবিতা লেখা হয়েছে, ইতিহাস রচিত হয়েছে। এখনো হচ্ছে। অর্থাৎ পরম্পরা আছে। সব বধ্যভূমি তারা সংরক্ষণ করেছে, শহীদদের সমাধি সুন্দর করে রেখেছে, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে। জাদুঘর বিশেষ করে গণহত্যা জাদুঘর নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে। স্কুলের ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে সেসব জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনো প্রজন্মের কাউকে গণহত্যা-নির্যাতনের কথা ভুলতে দেয়া হয় না। এর পরিপূরক হিসেবে নাৎসি-ফ্যাসিবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ এ থেকে বর্ণবাদের, জাতি বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। হলোকাস্ট আইন হয়েছে অনেক দেশে।

আমাদের এখানে এই পরম্পরাটি নেই। ১৯৫২ সালের পরম্পরা আছে। স্বাধীনতাবিরোধী, সামরিক স্বৈরশাসন সব সময়ে ২১ পালিত হয়েছে। জাতির বুননে এটি এমনভাবে আছে, কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে না।

১৯৭২-৭৫ বঙ্গবন্ধু সরকার গণহত্যা নিয়ে যে বলেনি বা গণহত্যাকারীদের বিচার যে চায়নি তা নয়। কিন্তু অন্য কারো মনে না থাকুক, আমাদের জেনারেশনের নিশ্চয় মনে আছে ১৯৭১-৭৪ কি অবস্থায় ছিল বাংলাদেশ। সারা জাতি বিষণ্ন। ৩০ লাখ পরিবারের কমপক্ষে ২০ জন করে আত্মীয় থাকলে তারা স্বজনহারা অবস্থায় শোকাতুর ছিলেন। পাঁচ লাখেরও বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছিলেন। একটি পরিবারে একটি মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার অর্থ সেই একইভাবে পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়া। শরণার্থীরা ধ্বংসস্তূপে ফিরেছিলেন। অবকাঠামো কিছু ছিল না। তারপর ছিল খাদ্যাভাব। অর্থ নেই। আর ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপার পাওয়ার ও তথাকথিত ইসলামি দেশসমূহের বিরোধিতা। প্রতিটি সমস্যাই ছিল অগ্রাধিকার। বঙ্গবন্ধুকে তা সামলাতে হয়েছে। এককভাবে গণহত্যার বিষয়টি তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি। বঙ্গবন্ধু শহীদদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন, বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের জন্য আইন করে তা সংবিধানের সুরক্ষায় এনেছিলেন। তিনি আর সময় পাননি।

এরপর তিন যুগ বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে বাঙালি পাকিস্তানিদের দ্বারা। পাকিস্তানে ইতিহাস পড়ানো হয় না। গত চার দমকে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ‘ইতিহাস’ শব্দটি বাদ পড়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তো বটেই। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি গণহত্যার স্মৃতিতে পলি জমেছে। এবং এই সুযোগ নিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী, বাঙালি পাকিস্তানি, পাকিস্তান। ইতিহাস সামগ্রিকভাবে বিচার না করলে এবং তা লালন না করলে কী হয়, বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাজনীতি এর প্রমাণ। ইতিহাসের সূত্রগুলো মননে গেঁথে দিতে হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণহত্যা। কারণ নয় মাসে পৃথিবীর কোথাও এত মানুষ হত্যা করা হয়নি। এত মানুষ নির্যাতিত হয়নি, এত নারী ধর্ষিতও হয়নি। অথচ এটি চোখের আড়ালে চলে গেল কীভাবে? এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র জড়িত।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে ১৯৭৫ ও জিয়াউর রহমানের নাম আসবেই। বঙ্গবন্ধু থাকবেন জাতির জনক হিসেবে। জিয়া থাকবেন বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের নায়ক ও বাঙালিত্ব বিনষ্টের ভিলেন হিসেবে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে খন্দকার মোশতাক থেকে জিয়াউর রহমানের নাম বেশি আসে।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় এলেন তখন বাঙালিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি কাজ করেছিলেন। এক. সংবিধানের মৌলনীতি বিনষ্ট করা যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বা অন্য কথায় যার ভিত্তি ছিল ত্রিশ লাখ শহীদ। দুই. স্বাধীনতাবিরোধীদের জেল থেকে মুক্ত করে স্বাধীন শুধু নয় ক্ষমতায় আনলেন এবং ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করণের যে ধারা ছিল সংবিধানে তা বাতিল করলেন। তিন. মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত স্মৃতিগুলোর অবলেপন। এভাবে পরম্পরা ছিন্ন হলো।

সংবিধান বদল ছিল স্মৃতির সঙ্গে দূরত্ব স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ। জয় বাংলা অলিখিতভাবে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হলো। এটি ছিল পরম্পরায় স্মৃতি জাগরূক রাখার প্রধান হাতিয়ার। যেখানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন ও হানাদাররা আত্মসমর্পণ করেছিল সে স্থানটিতে গড়ে তুললেন শিশুপার্ক। বীরাঙ্গনার জন্য ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো। মুক্তিযুদ্ধের গানের স্মৃতির বদলে এল শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’। এটি জিয়া আমলের থিম সংয়ে পরিণত হলো। এরশাদ এই ধারা বজায় রাখলেন। জেনারেল আমিন আহমদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের প্রধান থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের গানের রেকর্ড বের করেছিলেন। তাকে বদলি করে দেয়া হয় সেখান থেকে। সাভার স্মৃতিসৌধের নকশা বদলে মসজিদ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। খালেদা জিয়ার সময় ইতিহাসের মূল দলিল বদলে দেয়া হয়, পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃত করা হয়। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়। খালেদা-নিজামীর সময় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানো হয়। আমার বা শাহরিয়ার কবিরের মতো চুনোপুঁটিকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়। রাঘব বোয়ালদের কথা আর নাইবা বললাম। এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধা শব্দটিই নোংরা শব্দে পরিণত হয়। গণহত্যা-নির্যাতনের সেখানে স্থান থাকার কথা নয়। বীরাঙ্গনা বা শরণার্থীদের তো নয়ই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা, চীন, সৌদি আরবসহ মুসলমান গরিষ্ঠ দেশসমূহ সরাসরি বিরোধী ছিল। আবার ‘নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে ইউরোপীয় দেশসমূহ। লুঙ্গিপরা, জীর্ণশীর্ণ বাঙালিরা জিতবে এ কথা কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু জিতে গেল। এই বিজয়ের পর সমীকরণও বদলে গেল। গণহত্যার সঙ্গে এরা জড়িতÑ এ প্রচার শুরু হলে তারা আরো বিপদে পড়বে। কেননা ‘হলোকাস্ট’ বা ইহুদি নিধন তারা মনে রাখে কিন্তু বাঙালি হলে তা মনে রাখে না- এটি বর্ণবাদ। যেহেতু তারা গণতান্ত্রিক ও বর্ণবাদবিরোধী বলে নিজেদের প্রচার করে তাই তারা এ বিষয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কারণ বিশ্ব প্রচার মাধ্যম তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং বাংলাদেশের গণহত্যা বা ধর্ষণ প্রসঙ্গটি আর উঠে এল না। এবং এভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা চোখের আড়ালে চলে গেল।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেও আমরা আমাদের দাবিতে অটল ছিলাম। ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ করে জুনাইদ আহমেদের ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপ্লোডেড’। বইটি আমাদের হাতে এলে দেখি তা মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক একটি মিথ্যার গুদাম বিশেষ। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আমরা আবার একটি আলোচনা আহ্বান করি। গণহত্যাকে গুরুত্ব না দিলে কী হতে পারে এই বইটি দেখিয়ে তা তুলে ধরার ইচ্ছেও ছিল। আরেকটি কারণ ছিল। শাহরিয়ার কবির গত কয়েক বছর ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রচার চালিয়েছেন। কিন্তু সব সময় যে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন তা হলোÑ আপনাদের দেশে তা জাতীয়ভাবে পালিত হয় কিনা? অর্থাৎ নিজ দেশে পালিত না হলে অন্যের স্বীকৃতি আশা করি কীভাবে?

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ, যিনি আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রীও। সভায় আলোচনাকালে আমি বলেছিলাম, ‘আমরা আন্তর্জাতিক হাত ধোয়া দিবস পালন করি, কিন্তু গণহত্যা দিবস পালন করি না। আমরা সামরিক দিবস পালন করি কিন্তু (১ ডিসেম্বর) মুক্তিযোদ্ধা দিবস পালন করি না। অথচ আমরা নাকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। কী অ্যাবসার্ড অবস্থা।’

তোফায়েল আহমেদ বক্তৃতায় বললেন, আমিও তো মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আমি কেন বিষয়টি এভাবে দেখিনি? আমি লজ্জিত। আমি সংসদে এ কথা তুলব।’ এর আগে আমি বলেছিলাম, মাননীয় মন্ত্রী, আপনি যেহেতু সংসদে যাবেন সেহেতু এ প্রসঙ্গটি তুলুন। গণহত্যা দিবস তারপর না হয় পালন না-ই করলেন। কিন্তু ভিটামিন খাওয়া দিবস, হাত ধোয়া দিবস পালন করবেন আর এটি করবেন না তাহলে আপনারা হাসির পাত্রে পরিণত হবেন।’

তোফায়েল আহমেদ কথা রেখেছিলেন এবং এত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে অনেকে মনে করেছিলেন তিনি পড়ে যাবেন। জুনায়েদের বইটি দেখিয়েও বলেছিলেন, সরকারিভাবে এ অপপ্রচার চলছে। এরপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আধ ঘণ্টার এক বক্তব্য রাখলেন। জানালেন ২৫ মার্চ পালিত হবে গণহত্যা দিবস। এ জন্য সংসদে একদিন আলোচনাও হবে। সব সংসদ সদস্য এতে সম্মতি জানান। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন।

ছবি: মুনতাসীর মামুন

এবার আমি বইটি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। যে কোনো দেশে যে কোনো নাগরিক বাংলাদেশের বিষয়ে লিখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কারো কিছু বলার নেই। তার প্রতিবাদ জানানো যায়। কিন্তু সরকারিভাবে যদি অপপ্রচার চালানো হয় তাহলে সরকারিভাবেই তার কঠোর প্রতিবাদ জানানো উচিত।

ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে জুনায়েদ আহমদ একদল গবেষক নিয়ে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেন। ন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস নামে তার একটি কোম্পানি আছে। বইটি লেখা শেষ হলে ২০১৬ সালে এই কোম্পানির সাবসিডিয়ারি এজেএ বইটি প্রকাশ করে। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে করাচি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশসন এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এই সংস্থার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এর পৃষ্ঠপোষক। তাদের এই অনুষ্ঠান দেখা যাবেÑ যঃঃঢ়:/িি.িধলধঢ়ঁনষরংযবৎং.পড়স/-এ। এরপর পৃথিবীর একমাত্র আইনি সন্ত্রাসী সংস্থা আইএসআই ইসলামাবাদে সব বিদেশি দূতাবাস ও সংস্থার কাছে বইটি প্রেরণ করে। বাংলাদেশ দূতাবাসেও তা প্রেরণ করা হয়। সুতরাং ধরে নেয়া যায় পাকিস্তান সরকার পরিকল্পিতভাবে এ বই লিখেয়েছে এবং বিজয় দিবসকে ম্লান করার জন্য ওই দিনই বইটির প্রকাশনা উৎসব করেছে। জুনায়েদ একজন ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক যার সঙ্গে ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই।

আমরা লক্ষ করেছি, যারা কূটনৈতিক সার্ভিসে আছেন তাদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানের ব্যাপারে নমনীয়। এটি নাকি কূটনীতি। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা নাকি দরকারি। সম্পর্ক বাতিল করা দূরে থাকুক ডাউনগ্রেডও করা যাবে না। ওই যে বলেছিলাম, বাঙালি পাকিস্তানির সংখ্যা বেড়েছে এটি তার উদাহরণ। দেশের শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তানের সংসদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনেক বিষোদগার করে কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সংসদের প্রতিক্রিয়া ছিল কড়ি ও কোমল। সব সময় ভয় এই বুঝি পাকিস্তান চটে গেল। এটা নাকি কূটনীতি।

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা আইএসআই বাংলাদেশের বিলুপ্তি চেয়েছে। এবং চাইবে। বাংলাদেশ ‘মুজিব ও আওয়ামী লীগের সৃষ্টি’ এ তত্ত্ব তারা বিশ্বাস করে। এ কারণেই জামায়াত-বিএনপির উত্থানে তারা সবরকমের সহায়তা করেছে। এ কারণে ১৯৭১ সালে খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তারা সুসম্পর্ক তৈরি করেছিল, যে কারণে প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। এবং এ কারণেই বিএনপি-জামায়াত কখনো পাকিস্তানের সমালোচনা করেনি, পাকিস্তানের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের বিরোধিতা করেছে।

জুনায়েদের বইটিতেই প্রথম মিথ্যাচার করা হয়েছে তা নয়। এ মিথ্যাচার শুরু হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘এ গ্রেট ট্র্যাজেডি’ প্রকাশের মাধ্যমে। এরপর রচিত হয় কুতুবউদ্দিন আজিজের ‘ব্লাড এন্ড টিয়ার্স’। তারপর হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় শর্মিলা বোসের ‘ডেড রেকোনিং : মেমোরিস অব দি নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান।’ ২০১৫ সালে মিয়া আফ্রাসিয়াবের ‘১৯৭১ : ফ্যাক্টস এন্ড ফিকশন।’ সবগুলো বইয়েরই মূল চেষ্টা ছিল এ বক্তব্য দেয়া যে, ১৯৭১ সালে যা ঘটেছে বলে রটেছে তা অতিরঞ্জিত। গণহত্যা তেমন হয়নি। ধর্ষণ সামান্য, শর্মিলার ভাষায় মাত্র তিন হাজার। এ বইগুলোর দুর্বলতা হলো, সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ তারা ভালোভাবে করতে পারেনি। বইগুলো যে লেখানো হয়েছে তাও বুঝা যায়। যেমন কুতুবউদ্দিনের বই। বর্ণনাগুলো অতিরঞ্জিত। শুনেছি এবং এ কথা সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তানি কর্নেলরা শর্মিলাকে সব বিষয়ে তুষ্ট করেছে। তিনি তাদের পছন্দসই বালিকা। আর কর্নেলরাও বালিকার খুব পছন্দের। হামুদুর রহমান সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে একটি বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন যাতে এই গণহত্যার অভিযোগটি কম হয়। কিন্তু হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট কখনো সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়নি। কিছু অংশমাত্র প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান লেখক জুনায়েদের বইয়ের দুর্বলতা এই যে, এটি একটি কমিশন ওয়ার্কÑ তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি পাকি সেনাদের উপদেষ্টা। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কনসালটেন্সি ফার্ম যারা ১৯২৫ সাল থেকে ১৩৫০টির বেশি কনসালটেন্সি করেছে এবং এর উৎস যে আইএসআই সেটিও বোঝা যায়। এ কথা বলাও সত্যের অপলাপ হবে না যে, বইটি আইএসআই কমিশনকৃত লোকজন লিখে দিয়েছে যা তার নামে ছাপা হয়েছে এবং তিনি তার বিনিময়ে মোটাসোটা ইনাম পেয়েছেন। বইয়ের প্রধান দুর্বলতা এর টপ টু বটম মিথ্যাচার। কোথাও কোথাও দু’এক লাইন সত্য কথা আছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেসব তথ্য সত্য হিসেবে বিবেচিত তাও সে বইয়ে মিথ্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে। জুনায়েদের ভাষায়, বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৭১ সম্পর্কে যে ন্যারেটিভ প্রদান করে আসছে তা নস্যাতের জন্যই বইটি লেখা হয়েছে।

প্রথম অধ্যায়ের নাম- ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ এমিড মিথস এন্ড ফেবল্স’। অর্থাৎ উপকথা ও মিথের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ১৪টি মিথ কাজ করছে। বলা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান শোষণ করেছে পূর্ব পাকিস্তানকে। আসলে তা মিথ্যা। ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়নি। দুই লাখ নারী ধর্ষিতও হয়নি। হিন্দুদের হত্যার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়নি। মুক্তিবাহিনীই হত্যা করেছে বিহারিদের। দ্বিতীয় অধ্যায় : ‘ক্রিয়েশন অব পাকিস্তান’ বা পাকিস্তানের সৃষ্টি। হিন্দু জাতীয়তাবাদী, কংগ্রেস জাতীয়তাবাদী মুসলিম রাজনীতি ও ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ চায়নি। তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল এবং তারই ফল ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভাগ। তৃতীয় অধ্যায় : ‘ডিসমেম্বারমেন্ট স্টার্টস’ বা ভাগ হওয়ার প্রক্রিয়া। এ অধ্যায়ের যে বর্ণনা তা তার ‘মিথে’র সঙ্গে খাপ খায় না। এখানে প্রমাণ করতে পারেনি যে, পূর্বাঞ্চলে অসন্তোষ ছিল না। চতুর্থ অধ্যায় : ‘ইন্ডিয়াস ম্যাকিনেশন বা ভারতের ষড়যন্ত্র’। ভারতই বাংলাদেশকে ভাগ করেছে, সেই পুরানো তত্ত্ব আবার নতুন করে বলা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায় : ‘দি নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান ইনসার্জেন্সি’ বা ১৯৭১ সালের বিদ্রোহ। এর মূল প্রতিপাদ্য হলোÑ অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগকে ‘নিউট্রালাইজ’ ও সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে চেয়েছে যাতে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে দায়ী করা হয়েছে যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য। ষষ্ঠ অধ্যায় : ‘মুক্তিবাহিনীÑ ইটস ট্রু ফেস’ বা মুক্তিবাহিনীর প্রকৃত রূপ। মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করাই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য। বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের সৃষ্টি, মূলত এরা সন্ত্রাসী যারা দায়ী- most barbaric and vicious chapters of human miseries.. ২৫ মার্চের আগেই মুক্তিবাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছিল যে কারণে পাকিস্তানকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। গণহত্যার যে সব পরিচিত ছবি আমরা দেখি, তার কয়েকটি প্রকাশ করে বলা হয়েছে এসব হত্যাকাণ্ড মুক্তিবাহিনীই ঘটিয়েছে। বাকি দুটি অধ্যায় ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্কিত। পাকিস্তান সরকারের কাছে তারা সুপারিশ করেছে-

১। বিহারিদের ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার অথবা বাংলাদেশের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা যাতে বাংলাদেশ বাধ্য হয়। ‘বিহারি’দের ‘মেইনস্ট্রিমে’ নিতে।

২। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি সব সময় আলোচনায় রাখা ও এর কর্মকাণ্ডে চাপ প্রয়োগ।

৩। বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক দু’দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি।

৪। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য তথ্য তুলে ধরা যাতে এ সম্পর্কিত পরস্পরবিরোধী তথ্যের ব্যবহার হ্রাস পায়।

৫। পাকিস্তানের উচিত ‘প্র্যাগম্যাটিক স্টেট লেভেল ফরেন পলিসি’ নেয়া এবং বাংলাদেশকেও তাতে বাধ্য করা।

বই লেখার মূল উদ্দেশ্য বিবৃত হয়েছে ১৩৮ পৃষ্ঠার একটি মন্তব্যে।

‘Today, it has been almost forty five years that India created her illegitimate progeny, but the wounds in the hearts of Pakistanis remain fresh’

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার লোভ যে ১৯৭১ তা কোথাও তেমনভাবে বলা হয়নি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে ভারতের পুতুল বলা হয়েছে। প্রশংসা করা হয়েছে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির এ কারণে যে তারা ভারতবিরোধী, প্রো-পাকিস্তানি বা পাকিস্তানের পক্ষের।

আইএসআইয়ের এ গ্রন্থে যাই বলা হোক না কেন, নথিপত্র বলে অন্যরকম। শুধু তাই নয় পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকদেরও অনেক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি ও ইউপিএলের কর্ণধার জনাব মহিউদ্দিন আহমদ। তারা আমাদের যুক্তির সামনে কোনো কথা বলতে পারেননি। নিয়াজীর যে পরিকল্পনা একটি নথিতে পেয়েছি তা আইএসআই, হামুদুর রহমান কমিশন বা শর্মিলা বসুর বক্তব্য নাকচ করে দেয়।

আমি ১৯৯৮ সালে লাহোরে লে. জে. নিয়াজীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ইউপিএল-এর কর্ণধার মহিউদ্দিন আহমদ। নিয়াজী খুবই বিনয়ের সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করেছিলেন। আপ্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু আমরা সতর্কতার সঙ্গে আপ্যায়িত হওয়া থেকে বিরত থেকেছি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তার গ্রন্থে তিনি যা বলেছেন, সাক্ষাৎকারেও মোটামুটি তাই বলেছিলেন। এর মূল হলো, তিনি যা করেছেন তা নির্দেশিত হয়েই। বাঙালিদের প্রতি তার বিদ্বেষ নেই ইত্যাদি। আমরা তাতে ভুলিনি। কারণ, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জেনারেলরা শুধু নির্দেশিত হয়েই নয়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও বিভিন্ন কাজ করেছেন। এর প্রমাণ এই দলিলটি। নিয়াজী কর্তৃক লিখিত একটি চিঠি। চিঠির তিনটি পাতা পেয়েছি। খুব সম্ভব আরো দু’ এক পাতা ছিল ভূমিকা হিসেবে। এই চিঠি ছিল ব্যবসায়ী এহিয়া আহমদ বাওয়ানীর একটি ফাইলে। এর অর্থ পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জেনারেলরা বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন। চিঠিটি সেই ফাইল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন লতিফ বাওয়ানী জুটি মিলসের তৎকালীন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান। পরে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসের সচিব এসএম গোলাম নবীর সংগ্রহে আসে। দলিলটি আগে কেউ দেখেনি। বাংলাদেশে কী করা যেতে পারে তার বিবরণ ছিল চিঠিতে। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়াজী তা পাঠিয়েছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর কাছে। চিঠির যে অংশটি আমাদের হাতে এসেছে তার শিরোনাম ‘দি রেমেডি।’

‘দি রেমেডি’ বা ‘সমাধান’-এর আগে নিশ্চয় একটি পটভূমি ছিল যা আমরা পাইনি। ‘সমাধানে’ নিয়াজী উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চ/এপ্রিল মাসে বাঙালিদের শেষ বিদ্রোহ ছিল সুপরিকল্পিত; ঠাণ্ডা মাথায় নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বিহারি মুসলমানদের হত্যা করা হয়। বিহারি বলতে সাধারণত অবাঙালি মুসলমানদেরই বোঝায়Ñ তারা বিহার ও উত্তর প্রদেশ, বা বোম্বে এমনকি দক্ষিণ ভারত, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ এমনকি বেলুচিস্তান যেখান থেকেই আসুন না কেন। এই দুর্ভাগাদের পশ্চিমাও বলা হয়। তাদের হত্যাকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাঙালি। অনেক ক্ষেত্রে ভারতের সামরিক বাহিনীর হিন্দু সৈনিকরা এই তথাকথিত বিহারিদের বাঁচিয়েছে। তাদের হত্যা করা হয়েছে কারণ তারা ছিল পরম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর শুভার্থী। অন্যদিকে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক হিন্দু ব্যবসায়ী আছে। এই জয় বাংলা স্নোগানধারীরা এদের ভাই বলে মনে করে।

পাকিস্তানি জেনারেলদের যেসব লেখা পড়েছি তাতে তারা বিহারি ‘হত্যা’ ২৬ মার্চে গণহত্যা চালাবার একটি অজুহাত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এটি ছিল সরকারি লাইন। স্বাভাবিকভাবেই এটি মিথ্যা ওজুহাত। হিন্দুদের প্রতি তারা ছিলেন চরম বিদ্বেষী। নিয়াজী বোঝাতে চেয়েছেন, বিহারিদের প্রতি নিষ্ঠুরতা এত ভয়ঙ্কর ছিল যে হিন্দু ভারতীয় সৈনিকরা পর্যন্ত তা মানতে পারেনি, বিহারিদের রক্ষায় তারা এগিয়ে এসেছে। কিন্তু, মার্চ/এপ্রিল বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য আসবে কোত্থেকে?

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে অবশ্য নিয়াজী একটি সত্য কথা লিখেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাঙালি অভ্যুত্থানে শুধু আওয়ামী লীগাররাই নয়, পুরো বাঙালি জড়িত। সচিবালয়ে একজন সচিব থেকে জমাদার, মওলানা থেকে মসজিদের মুয়াজ্জিন, একজন উপাচার্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বেয়ারা, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে চিফ পোর্টার, এমনকি ইপিআর, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকরা সবাই এই বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত। শেখ মুজিব সরকারের সব কিছুই জানতে পারতেন। মার্চের ১ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো দেখলেও এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। বিভিন্ন বিভাগ, সংস্থার সবাই শোভাযাত্রার পর শোভাযাত্রা করেছেন, বাঙালিদের প্রতিটি পর্যায় থেকে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। এমনকি মুসলিম লীগের বাঙালি নেতা, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্যরা কেউই পিছিয়ে ছিল না। বিচ্ছিন্নতার বিষ প্রোথিত ছিল অনেক গভীরে। প্রয়াত আগা খান তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুধু হিটলারের ছিল না, ছিল পুরো জার্মান জাতির। একইভাবে এ বিদ্রোহ শুধু আওয়ামী লীগার বা মুক্তিবাহিনীর নয়, পুরো বাঙালি জাতির।

কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি কমিটির সদস্যরা বাঙালিদের সেনাবাহিনীর শাস্তি থেকে বাঁচাতে তৎপর। তারা বাংলাদেশ সমর্থকদের দলে ভিড়াবার চেষ্টা না করে বরং তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। তারা গ্রামাঞ্চলে যাচ্ছে না যেখানে এখন জয় বাংলা সেøাগানধারী ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সামরিক আইন কর্তৃপক্ষকে বিনীতভাবে জানানো যাচ্ছে পাকিস্তানপন্থি বলে পরিচিত বাঙালি নেতাদের পরামর্শ যেন সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। তাদের বিবৃতি আক্ষরিকভাবে না নেয়াই ভালো। কারণ তারা নিজ দেশে নিজেদের লোকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

নিয়াজীর এই পর্যবেক্ষণ অবশ্য সঠিক নয়। পাকিস্তানপন্থি দল ও নেতারা সর্বান্তকরণেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনীকে সমর্থন করেছিল। ট্র্যাজেডি হলো, তারা কখনো তা অনুধাবন করেনি। পাকিস্তানিরা বিন্দুমাত্র তাদের বিশ্বাস করেনি বরং ব্যবহার করেছে। শান্তি কমিটি সম্পর্কেও যা লিখেছেন তাও সত্য নয়। অনেকে অবস্থার ফেরে শান্তি কমিটিতে যোগ দিলেও এর অধিকাংশ ছিল চরম ভারতবিদ্বেষী ও পরম পাকিস্তান ভক্ত। পাকিস্তানিরা তাদেরও বিশ্বাস করেনি। নিয়াজী লিখেছেন, যারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন তাদের কোনো অধিকার নেই তাদের পক্ষে বলা যারা প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। আন্ডারলাইন করে দুটি লাইন লিখেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি একজন বিশ্বাসঘাতক, ইসলামের প্রতিও বিশ্বাসঘাতক। এ জীবনে তার একমাত্র পুরস্কার মৃত্যু এবং পরকালে চিরজীবনের জন্য দোজখ। বাঙালিদের চরিত্র সম্পর্কে জানার জন্য ভালো গ্রন্থ লর্ড ম্যাকাউলির ‘এ স্টাডি অফ ইন্ডিয়া’। এটি পড়লে চোখ খুলে যাবে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদে তিনি মন্তব্য করেছেন, বাঙালিরা কাপুরুষ এবং একজন কাপুরুষ প্রাথমিকভাবে নির্যাতনকারী এবং একজন প্রতারক। বিশ্বের যুদ্ধ এবং দাঙ্গার ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ পাওয়া যাবে না বিহারি হত্যার মতো। নিয়াজীর ট্র্যাজেডি হলো এই ‘কাপুরুষ’ বাঙালিদের কাছে তাকে সৈন্য সামন্ত নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল।

নিয়াজী বাঙালিদের ওপর এমন ক্ষিপ্ত ছিলেন যে, মন্তব্য করেছেন দিনাজপুর বা সান্তাহারে শান্তি কমিটির সদস্য যারা কুরআন হাতে শপথ নিয়েছিলেন, তারাই বিহারিদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের অস্ত্রহীন করে হত্যা করেছেন। কীভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ ধরনের লোকদের বিশ্বাস করতে পারে। এই প্রদেশ জয় করা হয়েছে। ১৯৪৪/৪৫ সালে রুশীরা জার্মানিদের প্রতি যে আচরণ করেছিল এ প্রদেশের লোকদের তেমন ব্যবহারই প্রাপ্য।

বিশ থেকে ত্রিশ লাখ জার্মানকে হত্যা করা হয়েছিল। সম্পূর্ণভাবে বাঙালিদের ভীত করতে না পারলে তাদের সোজা করা যাবে না।

নিয়াজীর আক্ষেপ বোঝা যায় পরের লাইনগুলোতে। তিনি লিখেছেন, এখনো ভারত তাদের বন্ধু। এখনো তারা লাখ লাখ হিন্দুকে আশ্রয় দিচ্ছে। একান্ত আলাপচারিতায় বাংলাদেশের কথাই বলছে। তার ভাষায়:

You scratch any Bengali and he is separationist.

এর ব্যতিক্রম খুবই কম। কমপক্ষে দশ বছর তাদের মগজ ধোলাই করতে হবে। তাদের ভাষা বদলে দিলেই একমাত্র তারা আবেগগতভাবে পশ্চিমবাংলা থেকে আলাদা হবে।

এর পরের অনুচ্ছেদের দশ লাইন বড় অক্ষরে টাইপ করা। এই অনুচ্ছেদে তার মূল বক্তব্যÑ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ হয়তো ভাবছেন, যথেষ্ট হয়েছে, দরজা খুলে দেয়া যাক, পাশ্চাত্যের সাংবাদিকরা আসুক, দেখুক সব স্বাভাবিক। তারা যদি এ লাইনে চিন্তা করেন তা হলে বলতে হবে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সংহতি থাকবে কিনা তা সন্দেহজনক। এখনো নমনীয় হওয়ার সময় আসেনি। এখনো আরো হত্যা চালাতে হবে, তার ভাষায়:

There must be more killing, more mopping up and more witch hunting.

নিয়াজীর মূল বক্তব্য, রুশীয় বা কমিউনিস্টরা যদি নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য লাখ লাখ মানুষের জমি কেড়ে নিতে পারে, তাহলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাকিস্তানের শত্রুদের হত্যার ব্যাপারে কেন শৈথিল্য দেখাবে? পাকিস্তান এবং এর সংহতিতে যারা বিশ্বাসী তাদেরই একমাত্র অধিকার আছে পাকিস্তান শাসন করার। নিয়াজী মনে করেন, শুধু হিন্দুদের হত্যাই নয় ইসলামের বিশ্বাসঘাতক বা তাদের ভ্রাতাদের মুরতাদদেরও হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানদের।

নিয়াজী শেষ পরিচ্ছেদে আবারো বিহারিদের উল্লেখ করে লিখেছেন, তাদের মধ্যে আস্থা ও সাহস ফিরিয়ে আনতে হবে যাদের ‘সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ পটভূমিতে তিনি ৮টি সুপারিশ (বা সমাধান) করেছেনÑ

১. ডাক্তার এবং প্রফেসরসহ ৭৫% বাঙালি সিভিল অফিসারদের হত্যা করতে হবে এবং বাকি উচ্চপদস্থদের পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করতে হবে। সেনা, পুলিশ ও সিভিল আর্মড ফোর্সকে বাঙালিশূন্য করতে হবে।

২. সেনা, কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সমস্ত গোয়েন্দা সার্ভিসকে বাঙালিমুক্ত করতে হবে। কারণ, এরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্পর্কে সরকারকে অন্ধকারে রাখছে।

৩. সারা পাকিস্তানের জন্য একটি জাতীয় ভাষাই থাকবে যা হবে একমাত্র ‘মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন।’

৪. প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগকে ‘স্ট্রিম লাইন’ করতে হবে।

৫. পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র এমন করতে হবে যেখানে বাংলা (বেঙ্গল)কে ১০ বছরের জন্য ‘স্পেশাল স্টেটাস’ দিতে হবে বা সেনাবাহিনী প্রধানের মতে যতদিন পর্যন্ত না মুক্তিবাহিনী বা অনুপ্রবেশকারীদের কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটে।

৬. পূর্ব পাকিস্তানের চারটি এলাকা বিহারি অধ্যুষিত করতে হবেÑ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সৈয়দপুর পার্বতীপুর। ওপরে বর্ণিত তিনটি শহরে বিহারি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এসব এলাকায় পাকিস্তানবিরোধী কোনো আন্দোলনের সূত্রপাত না করা যায়।

৭. ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব বিহারিকে সশস্ত্র করতে হবে এবং স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেনা গোয়েন্দা বিভাগ যাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেবে তাদেরই শুধু বাদ রাখা যাবে।

৮. গৃহায়ন এবং ত্রাণ বিভাগ পরিচালিত হবে অন্তত উপরের দিকে অবাঙালিদের দ্বারাÑ

ক. মিরপুরের ৫০০ প্লট এখন খালি আছে নিম্নআয়ের লোকদের জন্য। তা এখনই বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে।

খ. মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে সমস্ত স্টাফ কোয়ার্টার রিফিউজিদের [বিহারি] বরাদ্দ করতে হবে।

গ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের আশপাশের সব এলাকা অবাঙালিদের বরাদ্দ করতে হবে।

ঘ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর ও আশপাশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উর্দু স্কুল এবং কলেজে পরিণত করে অবাঙালি ছেলেমেয়েদের জন্য খুলে দিতে হবে।

ঙ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের সব সরকারি দোকান রিফিউজিদের বরাদ্দ করতে হবে।

চ. মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরের সব রেশন দোকানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

হামুদুর রহমান কমিশন নিয়ে আমি অন্য বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে তা আর করলাম না। আমি রাও ফরমান আলী ও তার বক্তব্য প্রসঙ্গে অন্যদের বক্তব্যও নিয়েছিলাম। রাও ফরমান আলী গণহত্যার কথা স্বীকার করেছেন এবং অন্যরা বলেছেন রাও ফরমান নিজেকে বাঁচাতে যা যা বলেছিলেন তাও ভড়ংবাজি। কমিশন অনেক সেনা অফিসারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা বলেছিল। পাকিস্তান তা করতে রাজি না হওয়ায় হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

রাও ফরমান আলীর যে সাক্ষাৎকার আমি ও মহিউদ্দিন আহমদ নিয়েছিলাম তাতে বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রসঙ্গটি ছিল। ফরমান এ সম্পর্কে তার বইয়ে যা বলেছেন, হামুদুর রহমানের সামনেও তাই বলেছেন।

সাক্ষাৎকারের খানিকটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

‘আমার যদ্দুর মনে পড়ে’, বললাম আমি, ‘জেনারেল নিয়াজী লিখেছেন যে, বাগদাদে চেঙ্গিস খান বা হালাকু খান যে রকম নির্মমতা দেখিয়েছিলেন তা দেখাতে হবে। তিনি বলেছিলেন, তিনি মাটি চান, মানুষ নয়। শুধু তাই রাও ফরমান আলী সে আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। আপনার ডায়েরিতেও লেখা ছিল- বাংলার সবুজকে লাল করে দিতে হবে।’

‘দুটি আলাদা ব্যাপার’, বললেন রাও ফরমান আলী, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমাকে বলতে হচ্ছে যে, জেনারেল নিয়াজী একজন মিথ্যাবাদী। সবুজ রঙ লাল করার কথায় আমি…’

‘সেটি আপনার বইতে বলেছেন’, বলি আমি।

‘আপনি কাজী জাফরকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন যে, টঙ্গীতে ঐ সময় এ বিষয়ে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন কিনা।’ জানালেন ফরমান, ‘আরও ছিলেন দুই তোয়াহা, একজন জামায়াতের, আরেকজন মার্কসবাদী। তিনি বক্তৃতায় বলতে চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী ধ্যান-ধারণাকে কমিউনিস্ট ধারণায় বা লাল ঝাণ্ডায় রূপান্তরিত করবেন। জেনারেল ইয়াকুব বিষয়টি আমাকে জানালে আমি ডায়েরিতে তা লিখে রাখি। একটি বাক্যই ছিল সেখানে। একটি বাক্য দিয়ে কি পুরো একটি পরিকল্পনা করা যায়। জেনারেল নিয়াজী এখন অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন। বইটি মিথ্যায় ভরা। বইটি তিনি নিজে লেখেনওনি। আপনি তাঁকে ঐ বইটির একটি পৃষ্ঠা না দেখে তাকে লিখতে বলুন। তিনি যদি পারেন তাহলে মেনে নেব বইটি তাঁর লেখা। টিক্কা কখনও ঐ ধরনের উক্তি করেননি যা আপনি বলেছেন। গভর্নর হিসেবে তিনি ছিলেন চমৎকার, অথচ দুর্ভাগ্য যে, বেলুচিস্তানে ও পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর একই দুর্নাম রটেছে।

‘আরও কী যেন বলছিলেন, নিয়াজী সম্পর্কে’, তাকে মনে করিয়ে দিই।

‘নিয়াজী যেদিন দায়িত্ব নিলেন’, ফরমান আবার শুরু করলেন, ‘সেদিন বললেন, মনে হয় দুশমনদের দেশে আছি। আমরা কিন্তু কখনো মনে করিনি আমরা দুশমনদের দেশে আছি, বরং আমরা মনে করেছি পাকিস্তানে আছি। তিনি আরো সব ভয়ঙ্কর কথা বলেছিলেন। যেমন এখানকার মানুষের পরিচয় বদলে দেব।’

‘বলা হয়ে থাকে আপনি রাজাকার বাহিনী গড়েছিলেন।’ জিজ্ঞেস করি আমি।

‘না, আমার মনে হয় মার্শাল ল’ সদর দফতর তা গঠন করেছিল।’ বললেন ফরমান।

‘আইডিয়াটা কার?’ জিজ্ঞেস করলেন মহিউদ্দিন ভাই।

‘ফোর্স কমান্ডারের।’

‘তিনি কে?’

‘নিয়াজী। তিনি আলশামস ও আলবদরের স্রষ্টা।’

‘তার বইটিও তিনি তাদের উৎসর্গ করেছেন।’ বলি আমি।

‘তিনি তাদের স্রষ্টা, ব্যবহারকারী সব।’ বললেন ফরমান।

‘নিয়াজী লিখেছেন, আলবদর ও আলশামস নেতাদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল’, জিজ্ঞেস করলেন মহিউদ্দিন ভাই।

‘আমি জানি না।’ উত্তর দিলেন ফরমান।

‘আপনি তো দেখছি কিছুই জানেন না’, খানিকটা বিদ্রƒপের সুরে বললেন মহিউদ্দিন ভাই।

‘দেখুন, আসল ঘটনা হলো ঐ সময় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছিল। আমি আর তখন কেউ না। গভর্নর মালেক পদত্যাগ করেন ভারতীয় আক্রমণের মুখে, আমার আর কোনো কিছু করার ছিল না।’

এরপর রাও ফরমান আলী ও আমার মধ্যে দ্রুত কিছু বাক্য বিনিময় হয় যা ছিল নিম্নরূপ:

আমি জিজ্ঞেস করি-

‘এ ঘটনা কী ১৩ ডিসেম্বর, বুদ্ধিজীবী হত্যার আগের দিন।’

‘হ্যাঁ, নিয়াজী ওদের হত্যার জন্য দোষারোপ করেছে … সকলেই আমাকে এজন্য দোষারোপ করে?’

‘তারা কেন আন্তর্জাতিক তথ্য মাধ্যমগুলোও এজন্য আপনাকে দায়ী করেছে। কেন?’

‘আমি জানি না। আমি তো একাই ছিলাম, তখন…’

‘আপনি যে বুদ্ধিজীবী হত্যার একজন তার তো সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে এবং কেউ সেগুলো এখনো অস্বীকার করেননি।’

‘আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আমি এগুলো দেখিনি।’

‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। আমার জানা মতে ঢাকার নটরডেম কলেজের সামনে একজন ডাক্তারকে হত্যা করা হয় অক্টোবরে। অনেক আগেই বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয় যার চূড়ান্ত পরিণত ঘটে ১৪ ডিসেম্বর। তাছাড়া নিয়াজী ব্যস্ত ছিলেন রণাঙ্গন নিয়ে আর আপনি ছিলেন প্রশাসনের ক্ষমতায়।’

‘নিয়াজী ছিলেন সামরিক আইন প্রশাসক।’

‘আপনি ছিলেন বেসামরিক প্রশাসন ও রাজনীতির দায়িত্বে। যেমন গোলাম আযম বা আবদুল মান্নানের সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তারা আপনার সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করত, বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করত। সুতরাং আপনার জানার বাইরে ঐ সময় কিছু ঘটবে কী করে। আপনি আমার এ মন্তব্যের সঙ্গে একমত?’

‘কেন একমত হব?’

‘কেননা আপনিই তো…’

‘কিছু না বলতে কি হত্যাকে বোঝায়?’

‘আপনি প্রশাসনের ক্ষমতায় ছিলেন।’

‘না, সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। এ আইনে গভর্নর হাউসের নিজস্ব কোনো স্থান ছিল না। গভর্নর হাউসের নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধু সচিবালয়, পুলিশ ও রাজাকারের ওপর। সেনাবাহিনী, ইপিসিএএফ ছিল সামরিক আইন প্রশাসক ও কোর কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণে। আমার অধীনে কিছুই ছিল না।’

‘তাহলে সব কিছুর জন্য জেনারেল নিয়াজী দায়ী?’

‘জেনারেল নিয়াজী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দায়ী।’

‘কিন্তু ঘটনা যা ঘটেছে বলে জানি…’

‘শুনুন।’ আমাকে থামিয়ে বিশাল বর্ণনা শুরু করেন রাও ফরমান আলী, ‘জেনারেল শামসের ছিলেন পিলখানার দায়িত্বে। তিনি আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি জানান, আমাদেরকে জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে সাধারণত আমাদের কোনো বৈঠক হয় না। জেনারেল শামসেরকে বললাম, ঠিক আছে যাব। পিলখানায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে এল। সেখানে দেখলাম কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে কেন। তিনি বললেন, বিশেষ উদ্দেশ্যে আমরা জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাচ্ছি, সে জন্যই গাড়িগুলো এখানে। তারপর বললেন, কয়েকজন লোককে গ্রেপ্তার করতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বললেন, কথাটা নিয়াজীকেই তুমি জিজ্ঞেস করো। এতে তোমার মত কী? আমি বললাম, স্যার, এখন কাউকে গ্রেপ্তারের সময় নয় বরং এখন কত লোক আমাদের সঙ্গে আছে সেটিই দেখার কথা।’

‘কত তারিখের ঘটনা এটা?’

‘৯ কিংবা ১০ ডিসেম্বরের ঘটনা। তারপর আমি আর কিছু জানি না।’

‘ঢাকার পতনের পর গভর্নর হাউসে আপনার একটি ডায়েরি পাওয়া গেছে সেখানে নিহত বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা ছিল।’

‘কাউকে হত্যা করতে হলে কি আমি এভাবে তালিকা সংরক্ষণ করব? অনেকে আমার কাছে এসে অনেকের নামে অভিযোগ করত। যেমন তিনি এটা করছেন, ওকে সাহায্য করছেন। আমি তাদের নাম টুকে রাখতাম, এর সঙ্গে ঐ হত্যার কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘তার মানে দাঁড়ালো, আপনি বুদ্ধিজীবী হত্যা সম্পর্কে জানেন না, বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কে জানেন না…’

কথাটা শেষ করতে দিলেন না ফরমান। বললেন, ‘গণহত্যা, গণহত্যা হয়নি।’

‘গণহত্যা হয়নি মানে কী বলতে চান?’ পাল্টা প্রশ্ন করি আমি।

‘গণহত্যা হয়নি।’

‘পৃথিবীর সমস্ত সংবাদপত্রে লিখেছে গণহত্যা হয়েছে।’

‘না ঠিক নয়।’

‘আচ্ছা জেনারেল’, প্রশ্ন করি আমি, ‘বসনিয়া, হার্জিগোভেনিয়ায় কী হয়েছে বা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলো যে খবর দিচ্ছে তা কি মিথ্যা?’

‘সঠিক খবর তারা দিচ্ছে না।’

‘আচ্ছা, গণহত্যা হয়নি। কিন্তু মানুষ তো মারা গিয়েছিল?’

‘হ্যাঁ, এ রকম একটা ঘটনা ঘটলে তো কয়েকজন মারা যাবেই।’

‘আচ্ছা কত মারা যেতে পারে। দশ, বিশ, পঞ্চাশ হাজার?’ পঞ্চাশ হাজারটি জোরের সঙ্গে বলি।

‘হ্যাঁ, হতে পারে।’

আমি এ উত্তরের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ধীর কণ্ঠে বললাম, ‘জেনারেল, ৫০ হাজার লোক হত্যা যদি গণহত্যা না হয়, তাহলে গণহত্যা কাকে বলে?’

জেনারেল রাও ফরমান আলীর উত্তর দেয়ার কিছু ছিল না।

আলতাফ গওহরের সঙ্গে যখন এ প্রসঙ্গে আলোচনা করছি তখন তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করলেন। তাঁর এক বন্ধু এসে তাঁকে খবর দিয়েছিল, বাঙালি-হত্যার জন্য একটি তালিকা হয়েছে। তাঁর এক বন্ধুর নামও সেখানে আছে। আলতাফ গওহর কি কিছু করতে পারবেন? গওহর জানালেন, আমাদের এক পরিচিত যিনি ফরমানেরও পরিচিত তাকে বিষয়টা জানালাম এবং ফরমানের সঙ্গে দেখা করতে বললাম। সে ফরমানের সঙ্গে দেখা করে তালিকা থেকে নামটি বাদ দেয়ার অনুরোধ জানাল। ‘ফরমান ড্রয়ার থেকে একটি তালিকা বের করে নামটি কেটে দিলেন। সেই নামটি ছিল সানাউল হকের।’

ইসলামাবাদে এয়ার মার্শাল আসগর খানের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়েছিলাম। বললাম, ফরমান আলী বলছেন, ১৯৭১ সালে ঢাকায় কী হয়েছিল তা তিনি জানেন না। বলেই হেসে ফেললাম। আসগর খানও হেসে ফেললেন। তারপর মৃদুভাবে বললেন, ‘দ্যাট ইল ফেমড ম্যান। এখন সব ফিলোসফিক্যাল ও হাই আইডিয়ালের কথা বলছে।’

কমিশন ফরমানকে এই দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। সেটা স্বাভাবিক। কারণ ফরমান দায়ী হলে যুদ্ধটাকেই স্বীকার করে নেয়া হয়। বরং তিনি লিখেছেন, ‘আমার আশঙ্কা পূর্ববর্তী আদেশকে বাতিল করে সম্ভবত নতুন আদেশ আর জারি করা হয়নি এবং কিছু লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আমি আজও পর্যন্ত জানি না যে, কোথায় রাখা হয়েছিল। সম্ভবত তাদেরকে এমন কোথাও বন্দি করা হয়েছিল, যার প্রহরায় ছিল মুজাহিদরা। আত্মসমর্পণের পর ঢাকা গ্যারিসনের কমান্ডাররা তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল এবং তারা মুক্তিবাহিনীর ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কারণ মুক্তিবাহিনী নির্দয়ভাবে মুজাহিদদের হত্যা করছিল। পাকিস্তান  আর্মিকে দুর্নাম দেয়ার উদ্দেশ্যে মুক্তিবাহিনী কিংবা ইন্ডিয়ান আর্মিও বন্দি ব্যক্তিদের হত্যা করে থাকতে পারে। ভারতীয়রা ইতোমধ্যেই ঢাকা দখল করে নিয়েছিল।’

[They could have been killed by anybody except the Pakistan army as it had already surrendered on 16th December]

অর্থাৎ তিনি তো ননই, পাকিস্তান  হানাদারবাহিনীও নয়, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল মুক্তিবাহিনী অথবা ভারতীয় বাহিনী। এ যে কত বড় মিথ্যাচার তা বলাই বাহুল্য। তিনি কি ভুলে গেছেন বুদ্ধিজীবীদের শুধু ১৪ ডিসেম্বর নয় এর আগে থেকে হত্যা করা হচ্ছিল?

রিপোর্টের পঞ্চম ভাগের তৃতীয় অধ্যায়ে কতিপয় সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তার পেশাগত দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশন বলেছে, বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ শুনে কমিশন অভিযুক্ত করেছে ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে। তারা হলেন-

১। লে. জে. আলী আবদুল্লাহ খান নিয়াজী

২। মে. জে. মোহাম্মদ জামশেদ

৩। মে. জে. এ. রহিম খান

৪। ব্রিগেডিয়ার জি এম বাকির সিদ্দিকী

৫। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়াত

৬। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ আসলাম নিয়াজী

বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছে তিনজনের বিরুদ্ধে। তারা হলেন-

১। ব্রিগেডিয়ার এস এ আনসারী

২। ব্রিগেডিয়ার মনজুর আহমদ

৩। ব্রিগেডিয়ার আবদুল কাদির খান।

এরপর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলা হয়েছে, তিনি ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। এবং যুদ্ধের সময় তার ওপর সামরিক কোনো দায়িত্বও ন্যস্ত ছিল না। বিভিন্ন পদে তিনি আন্তরিক, সদিচ্ছাসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান একজন স্টাফ অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন-

Maj. Gen. Farman Ali merely functioned as an intelligent. well-intentioned and sincere staff officer in the various appointment held by him.

সুতরাং ফরমান আলী ছাড়া পেলেন। ছাড়া পেলেন টিক্কা খানও। এর একটি কারণ, তিনি ঢাকা ছেড়ে অনেক আগেই চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, ভুট্টোর সময় (খুব সম্ভব) প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ফরমান আলী একটি পদ পেয়েছিলেন। আর টিক্কা খান ভুট্টোর নির্দেশে তখন বেলুচিস্তানে কম্বিং অপারেশন করেন অনেকটা ঢাকা স্টাইলেই। এবং ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ উপাধি লাভ করেন। পাকিস্তানের সম্মানিত রাজনীতিবিদ শেরবাজ খান মাজারির আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ আছে। উল্লেখ্য, ভুট্টো টিক্কা ঔানকে সেনাপতি করেছিলেন।

এ ছাড়াও কমিশন আরো কয়েকজনকে অভিযুক্ত করেছে এ কারণে যে তারা ষড়যন্ত্র করে সংবিধান উল্টে, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ১৯৭১ সালে তাদের আচরণও লজ্জাজনক। কমিশনের ভাষায়-

… who have brought disgrace and defeat to Pakistan by their subversion of the constitution, usurpation of political power by criminal conspiracy, their professional incompetence, culpable negligence and willful neglect in the performance of their duties and physical and moral cowardice in abandoning the fight when they had the capability and resource to resist the enemy.

কমিশনের ভাষায় তাদের ‘পাবলিক ট্রায়াল’ হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ কেউ না করে। কমিশন যাদের ‘পাবলিক ট্রায়ালের’ কথা বলেছে। তারা হলেন-

১। জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান

২। জেনারেল আবদুল হামিদ খান

৩। লে. জে. এস. জি. এম. এম. পীরজাদা

৪। লে. জে. গুল হাসান

৫। মে. জে. মোহাম্মদ উমর

৬। মে. জে. মিঠা।

পাকিস্তানে এ বিষয় নিয়ে যতজন নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলোচনা করেছি প্রায় সবাই একই সুরে বলেছেন, ২৫ মার্চ ও পরে কী ঘটেছে বাংলাদেশে তা তারা জানতেন না। কিন্তু তাদের বিভিন্ন কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে তারা তা জানতেন। হামুদুর রহমান কমিশনও একই কথা বলেছেন। পাকিস্তানে যদি কেউ কোনো কিছু না-ই জানবে তাহলে ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তানে প্রতিবাদ হয়েছিল কেন? এবং কী নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছিল? প্রতিবাদ কম হতে পারে, প্রতিবাদে সোচ্চার সাধারণ মানুষ বা রাজনীতিবিদের সংখ্যা কম হতে পারে কিন্তু হয়েছিল তো। আমরা অবশ্য সে সম্পর্কে কম জানি। আর নীতিনির্ধারকরা যদি কিছু না-ই জানেন তবে নিয়মিত পাকি সৈন্যদের ঢাকায় পাঠান হচ্ছিল কেন? ইয়াহিয়া খানই বা কাদের মে মাসে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন? উপনির্বাচনই বা কেন হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে? এবং কেন-ই বা বেসামরিক গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল?

এ প্রসঙ্গে প্রথমে পাকিস্তানে প্রতিবাদের ধরনটি উল্লেখ করছি। এ ধরন দেখলেই বোঝা যাবে, লুট, ধর্ষণ, গণহত্যার বিষয়টি নীতিনির্ধারক বা রাজনীতিবিদদের কাছে অজ্ঞাত ছিল না।

১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশে হানাদার বাহিনী সংঘটিত কার্যাবলির প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদের সংখ্যা মুষ্টিমেয়।

সাহিত্যিক আহমদ সেলিম ইসলামাবাদে আমাকে বলেছিলেন, ২৭ মার্চ লাহোরে সুফি লাল হুসেইনের মাজারে মিছিল করে যাওয়ার সময় তারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আহমদ সেলিম লিখেছিলেন কবিতাÑ

“হে লাল হুসেইন! লালনের ভাই

জেগে ওঠ! বাংলায় হত্যা করা হচ্ছে তোমার মধুদের

বারবার তারা গুলিবিদ্ধ করেছে লালনের গান

আটচল্লিশে, বায়ান্নতে এবং তারপরেও

আর আজ প্রজ্বলন্ত

রবি ঠাকুর ও নজরুলের গান

জেগে ওঠ লাল হুসেইন, মধু আজ নিঃসঙ্গ,

আলিঙ্গন করো তাকে

তার দিকে ছুটে আসা বুলেটের মোকাবিলা করো

তোমার গান দিয়ে

জেগে ওঠ লাল হুসেইন

বাংলার ভাইরা এগিয়ে আসছে

জেগে ওঠ কবি, কোথায় তোমার বন্দুক?”

[মফিদুল হক অনূদিত]

আহমদ সেলিম ও তাঁর বেশ কিছু সাথীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেলিম জানিয়েছেন, সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তানে অনেকে কবিতা/গান লিখে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন যার সংকলন করলে বেশ মোটাসোটা একটি বই হবে। কিন্তু কেউ এর খবর জানে না। বিখ্যাত কবি হাবিব জালেবি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তাকে জেলে পোরা হয়।

লাহোরের তাহেরা মজহার ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী মিলে মিছিল করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত প্রতিবাদও কিছু হয়েছে যা আমাদের জানা নেই। যেমন ড. তারিক রহমান। ১৯৭১ সালে ছিলেন সেনাবাহিনীর ক্যাডেট। তিনি কমিশন পাওয়ার পরপর পদত্যাগ করেন। কোর্ট মার্শাল হতো তাঁর। কিন্তু বাবা ব্রিগেডিয়ার হওয়ায় বেঁচে যান। এখন ইসলামাবাদের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তার সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল ইসলামাবাদে। শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, এতে সাহসের কোনো ব্যাপার নেই। মানবিকতার বাইরে আমি যেতে পারি না। তিনি আমাকে যা বলেছিলেন তাই সংহতভাবে লিখেছেন আহমদ সেলিমের একটি বইয়ের ভূমিকার উপসংহারেÑ “আসুন আমরা সবাই মিলে লিখি, কথা বলি, ছবি আঁকিÑ স্মরণ করি ১৯৭১ সালকে এর সকল নির্মম বাস্তবতাসমেত। আসুন আমরা ক্ষমা চাই মৃতদের কাছে। আসুন আমরা সচেষ্ট হই সমঝোতা ও ক্ষমা অর্জনে। এতে করে অতীত পাল্টে যাবে না তবে হয়তো ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে। এটা সহায়তা করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় বন্ধন গড়তে এবং আরো যা গুরুত্বপূর্ণ এটা আমাদের সাহায্য করবে আরেকটি বাংলাদেশ সৃষ্টি পরিহারে।” বর্তমান পাকিস্তানে যে সহিংসা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব দেখা দিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ মন্তব্য করেছেন। সাংবাদিক আই এ রেহমানের কথা আগে বলেছি। ওই সময় যেমন, এখনো তেমন কঠোর ভাষায় তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। আমাকে তিনি বলেছিলেন, হিন্দু ও ব্রিটিশরা যে পরিমাণ মুসলমান হত্যা করেছে আমরা মুসলমান হিসেবে তার থেকে বেশি মুসলমান হত্যা করেছি। কথাটি সত্য। কিন্তু এই সত্য বলার সাহস আছে কয়জনের? আই এ রেহমান বলেন, “অনেকে বলে ১৯৭১-এ কী হয়েছে এখানকার বাসিন্দারা তা জানত না। এগুলো খোঁড়া যুক্তি। কমবেশি তারা জানত। কারণ তারা Supported the massacre of their compatriots in the eastern wing. With a very few honorable exceptions, the West Pakistan population, led by politicians, academics, bureaucrats and opinion makers, choose to back the senseless carnage, and there were many who fought over the spoils.

সুতরাং, পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশে কী ঘটছে তা জানতেন না এ কথা বিশ্বাসযোগ্য না। জানতেন, কিন্তু কমিশনে তা তিনি উল্লেখ করতে পারেন না। বরং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা হ্রাস এবং তাকে ঘিরে বাতাবরণ তৈরি করাই ছিল কৌশল। সে প্রচেষ্টাই তিনি নিয়েছেন রিপোর্ট রচনার সময়।

এই অধ্যায়ের উপসংহারে কমিশন বলছে, (অনুচ্ছেদ ৩৮) ২৫ মার্চের সময় এবং পরবর্তীকালে সামরিক বাহিনী যে অতিরিক্ত করেছে তা ঠিক তবে ঢাকা কর্তৃপক্ষ এ সম্পর্ক যে বিবরণ ও পরিসংখ্যান বলে তা অতিরঞ্জিত ও কল্পনাপ্রসূত। কথিত কিছু ঘটনা ঘটেইনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কল্পনারঞ্জিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করা যায়। আওয়ামী লীগ সেনাবাহিনীকে প্রবলভাবে প্ররোচনা যুগিয়েছে। তা ছাড়া কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য কঠোর সামরিক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। তা সত্ত্বেও কমিশন মনে করে পাকিস্তানি বাহিনী অতিরিক্ত যা করেছে তা যুক্তিযুক্ত নয়। সুতরাং, যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আসল ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি পাকিস্তানিরা এড়াতে চায়। ভান করে যে, তারা কিছুই জানত না। তৎকালীন পাকিস্তানের তথ্য সচিব রোয়েদাদ খান, নিরাপত্তা পরিষদের সচিব জেনারেল উমর, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো, পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী- সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি ২৫ মার্চ বা তার পরবর্তীতে বাংলাদেশে কি ঘটেছে তা তারা জানেন কী না? সবাই অস্বীকার করেছেন বা এড়িয়ে গেছেন।

জে. উমর ছিলেন নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব, ইয়াহিয়ার দক্ষিণ হস্ত। ২৫ মার্চ ঢাকায় ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েকবার এসেছেন ঢাকায়। করাচিতে তার বাসভবনে গেলাম দেখা করতে। আমাদের দেখে তিনি এমনভাবে অভ্যর্থনা জানালেন যাতে মনে হলো তিনি হারানো স্বজনদের খুঁজে পেয়েছেন। বললেন, আমাদের অর্থাৎ বাঙালি ভাইদের জন্য তিনি এতক্ষণ কুরআন শরীফ পড়ছিলেন এবং কাঁদছিলেন। কী থেকে যে কী হয়ে গেল!

জিজ্ঞেস করলাম, “২৫ মার্চ সম্পর্কে কিছু জানেন?”

নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বললেন, “না”।

“২৫ পরবর্তী ঘটনাবলি সম্পর্কে কিছু জানেন?”

“না।”

“আপনি নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব ছিলেন এবং আপনি আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে, কিছুই জানেন না।”

“আমি কাউন্সিলের সামান্য সদস্যসচিব ছিলাম। কাউন্সিলের কোনো মিটিংই ডাকা হতো না, কোনো ক্ষমতাও ছিল না।”

রফি রাজা পিপিপি করতেন এবং ঘনিষ্ঠ ছিলেন ভুট্টোর। ২৫ মার্চ ভুট্টোর সঙ্গে ছিলেন ঢাকায়। করাচিতে তাঁর বাসায় আলাপকালে এ প্রসঙ্গ এল। তিনি বললেন, “উমর জানে না মানে? ঢাকা থেকে আমরা রওনা হয়েছি। প্লেনে ঢুকল সে একটা ভাব নিয়ে। ভুট্টো বা আমাকে চেনে বলে মনে হলো না। কাউকে দেখেও দেখল না। ঢাকায় কী হয়েছে সে জানে না?”

আলতাফ গওহর ইসলামাবাদে তার বাসায় চা খেতে খেতে বললেন, “শোনেন, রোয়েদাদ এবং উমর প্রায়ই যেত ঢাকায়। ফিরে এসে, বিকেলে আমার বাসায় আড্ডা দিত। কী ঘটছে ঢাকায় তার বর্ণনা দিত। আপনারা রোয়েদাদকে আমার রেফারেন্স দিয়ে জিজ্ঞেস করবেন এ কথা সত্য কি না?”

ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকিও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। ২৫ মার্চের আগে এবং পরে জেনারেল উমরের সঙ্গে তার যোগাযোগ রাখতে হয়েছে। লিখেছেন তিনি, এবং বলেছেনও যে, উমর ছিলেন ইয়াহিয়ার প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা। ২৫ মার্চের ঠিক আগে, ঢাকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিদ্দিকিকে বলেছিলেন, তুমি কী ধরনের পাবলিক রিলেশনস ডিরেক্টর যে ÒCan’t even control these bustards’

নিয়াজীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় মনে হলো তিনি গণহত্যা বিষয়টি বুঝছেন না। মানুষ মারা গেছে কিনা সে সম্পর্কেও জানেন না। খুব সম্ভব এ ভাবটি লোক দেখানো। কারণ, তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি ২৫ মার্চের ঢাকা অভিযানকে হালাকু খানের অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

রোয়েদাদ খান ছিলেন তখন তথ্য সচিব এবং প্রভাবশালী। পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। বাংলাদেশে কী ঘটছে তা বহির্বিশ্বে জানাবার ভার ছিল তার ওপর। ২৫ মার্চ তিনি ছিলেন ঢাকায়।

ইসলামাবাদে তার সঙ্গে দেখা করি। না। তিনি কিছুই জানেন না। “না, আমি জানি না কী হয়েছে। অন্তত রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত আমি কোনো বন্দুকের আওয়াজ শুনিনি।”

ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকি ২৫ মার্চের ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছেন, বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্কার করা হয় এবং ধরে নেয়া হয় পাকিস্তানের খারাপ ইমেজ তারাই সৃষ্টি করেছে এ কারণে। কিন্তু, একদিক থেকে, লিখিছেন তিনি, বহিষ্কার করে ভালোই হয়েছিল। কারণ,

Dhaka, on March 26 and for several day to come, was virtually a media men’s paradise. It was the picture of death and desolation. Every dead body by the road side, every bombed-out building, every barricade, every tank, truck and Jeep, was a story for the avaricious TV man and news photographer, and they missed nearly all that.

এবার দেখা যাক, মূল বিষয় গণহত্যা সম্পর্কে কমিশন কী মনে করে?

কমিশনের মতে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মতে পাকিস্তানি বাহিনী ত্রিশ লাখ বাঙালি ও দুই লাখ রমণী ধর্ষণ করেছে। এ সংখ্যা যে অতিরঞ্জিত তা বোঝাবার জন্য যুক্তির কোনো প্রয়োজন নেই। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সমস্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের পক্ষেও এতো হত্যা ও ধর্ষণ সম্ভব নয়। কারণ, পাকিস্তানি বাহিনী সব সময় মুক্তিবাহিনী, ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও পরে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। শুধু তাই নয়, ব্যস্ত ছিল তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখা ও ৭ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর কাজে। সুতরাং ঢাকার কর্তৃপক্ষ গণহত্যা ও ধর্ষণের যে হিসাব দিচ্ছে তা হাস্যকর ও কল্পনারঞ্জিত। [Fantastic and fanciful]

তাহলে, হত্যার পরিমাণ কতো? কমিশন অনেক ভাবনা চিন্তা করে জানাচ্ছে, সদর দপ্তর যে হিসাব দিয়েছে সেটিই গ্রহণযোগ্য, নিহতের সংখ্যা ছাব্বিশ হাজারের বেশি নয়।

এ বিষয়ে বাকবিতণ্ডা পাকি ও বাংলাদেশি পাকিরা করতে পারে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই তা নিয়ে বিতর্ক করবে না। তবুও নতুন প্রজন্ম ও যারা বাংলাদেশের পাঠক নয় তাদের জ্ঞাতার্থে কয়েকটি উদাহরণ দেব।

মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আমরা খুলনার চুকনগর গিয়েছিলাম তথ্য সংগ্রহে ২০০০ সালের দিকে। সেখানে আমরা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া দুশোজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। চুকনগরে ১৯৭১ সালের মে মাসে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় কমপক্ষে দশ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এতো কম সময়ে এতো মানুষ হত্যার নজির বিরল। খালি কী চুকনগরে? বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে, বড় শহরে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

বেশ কিছু দিন আগে মাঠপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের জন্য বরিশালের স্বরূপকাঠির গভীর এক গ্রামে গিয়েছিলাম। ছোট গ্রাম। কয়েক ঘর চাষি বাস করেন। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, ১৯৭১ সালে পাকিরা এখানে এসেছিল কিনা? তারা জানালেন, গানবোটে করে এসেছিল এবং মানুষ হত্যা করেছিল। আমি যখন ওই অঞ্চলে যাই তখন যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তারপরও সে গ্রামে পৌঁছতে আমার বেশ সময় লেগেছে। ১৯৭১ সালে সে গ্রামে পৌঁছা আরো কষ্টকর ছিল। তারপরও পাকিরা সেই গ্রামে গিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে পাকি ও তাদের অনুচররা গিয়ে মানুষ হত্যা করেনি। ৬৪ হাজার গ্রামে গড়ে ১০ করে হত্যা করলেও তো সে সংখ্যা হয় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। আমাদের হিসাব বাদ দিই, রাও ফরমান আলীও তো পঞ্চাশ হাজারের কথা স্বীকার করেছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাকিস্তানের দুই নম্বর ব্যক্তিটিই যদি এ কথা বলে তখন কমিশনের ২৬০০০ সম্পর্কে আর কী বলব?

এখানে আরো উল্লেখ্য, কমিশন কিন্তু বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য প্রথমেই একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বলেছে গণহত্যার বিষয়টি কল্পনারঞ্জিত। বিচারের শুরুতেই রায় দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানি বিচারকদের এটি অবশ্য একটি ঐতিহ্য।

শেখ হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা নামক রাষ্ট্রীয় পুরস্কারটি দিয়েছেন বেশ ক’জন পাকিস্তানিকে। তারাও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঢাকায় এসে পুরস্কার নিয়েছেন। সেটি সারা বিশ্বে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। শেখ হাসিনা কি গণহত্যাকারীদের ধরে পুরস্কৃত করেছেন? নাকি গণহত্যার বিরুদ্ধে যারা ছিল তাদের পুরস্কার দিয়েছেন। এ পুরস্কার গ্রহণের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ সত্য যে, পাকিস্তান গণহত্যা চালিয়েছিল। জুনায়েদ আহমেদ অবশ্য এ বিষয়ে নিশ্চুপ।

গণহত্যা নির্যাতনকে গুরুত্ব না দেয়ায়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পাকিস্তান সমর্থক বাঙালি পাকিস্তানিরা এর সুযোগ নিতে চেয়েছে। জামায়াত গণহত্যা অস্বীকার নয় তারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন শুরু করে। উল্লেখ্য, শাসন ক্ষমতায় থাকার পরও জামায়াতীরা শহীদ মিনার বা সাভারের স্মৃতিসৌধে কখনো যেতে পারেনি।

শেখ হাসিনা সরকার যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করে তখন হঠাৎ গণহত্যা অর্থাৎ ৩০ লাখ শহীদদের নিয়ে বিতর্ক তোলেন বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি বিভিন্ন কাগজে এ নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। খালেদা জিয়াও ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে কয়েকবার প্রশ্ন তোলেন। ভাবা যায়, যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ৩০ লাখ শহীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত সাভার স্মৃতিসৌধে প্রতি বছর পুষ্পস্তবক দিয়েছেন, এখনো দেন তিনিও প্রশ্ন তোলেন গণহত্যা নিয়ে। কারণ গণহত্যার কারণে ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হয়েছিল। গণহত্যা হয়নি বা তা বিতর্কিত করলে বিচারের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়। জামায়াত তখন প্রচুর টাকা ঢালছিল বলে সারা দেশে চাউর হয়ে গিয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল বন্ধে, গণহত্যা নিয়ে বিতর্ক তোলার জন্য দেশে-বিদেশে এই টাকা বিতরিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান যখন যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে প্রথম ডকুমেন্টারিটি করেন তখন তিনি বাংলাদেশের আইনবিদ ও রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের জ্যেষ্ঠ কন্যাকে বিয়ে করেননি। ডেভিডকে নিয়ে তখন আমরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি স্বাভাবিকভাবেই। কারণ যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে তখন আন্দোলনের শুরু। লন্ডনেও তখন ড. কামালের কন্যা সারাহ্ ও বাঙালি তরুণ-তরুণীরা এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। ভেডিডকেও তখন তাদের সঙ্গে দেখেছি। এরপর ডেভিড এসেছেন এদেশে মাঝে মাঝে, যোগাযোগ হয়েছে বাংলাদেশের অনেকের সঙ্গে, তারপর এক সময় ড.  কামাল হোসেনের জামাতা হিসেবে এ দেশেই ফিরে এসেছেন। এখন ইংরেজি দৈনিক দি নিউএজে কাজ করছেন।

যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে ডেভিড বিভিন্ন প্রতিবেদন লেখা শুরু করলেন পত্রিকায় এবং এ প্রতিবেদনগুলোতে আমরা দেখলাম, আগের ডেভিড নেই। যে প্যাশন নিয়ে তিনি এক সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে নেমেছেন এখন দেখা যাচ্ছে, সেই একই প্যাশন নিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে নেমেছেন। এর কারণটি কী তা আমরা বুঝতে অক্ষম। জামায়াতের লবিস্ট/আইনজীবীরা বিদেশে বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যা বলছিল, ডেভিডের ভাষাও ক্রমে দেখা গেল সে রকম হয়ে যাচ্ছে। জামায়াত প্রচুর পয়সা দিয়েছে এবং দিচ্ছে লবিস্টদের। এক প্রতিবেদনে দেখেছিলাম, মীর কাশেম আলী ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন লবিস্টদের। সত্য মিথ্যা জানি না। ডেভিডের মতো একই রকমভাবে ইকোনমিস্ট ও আল জাজিরাও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচার করছে। এক সময় আল জাজিরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে বলেছিল। এ দুটি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক নাকি কাতারের শেখ পরিবার। এসবের সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক আছে কিনা জানি না, কিন্তু তার বক্তব্য তাদের মতোই।

যুদ্ধারাধ বিচার নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করায় ডেভিডকে ইতোমধ্যে আদালত তলব করেছে। ডেভিডকে দমানো যায়নি কারণ তার বোধহয় এই প্রতীতি জন্মেছে যে, দেশের সেরা আইনবিদ ও সুপরিচিত আইনবিদের তিনি পরিবারভুক্ত। তার কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে আবারো ডেভিডকে তলব করা হয়েছে আদালত অবমাননার জন্য। কোনো একটি লেখায় ডেভিড মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে ২৪ তারিখে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় ডেভিড একটি কলামও লিখেছেন। বর্তমান নিবন্ধ সেই প্রবন্ধ নিয়ে। প্রথমে দেখা যাক ডেভিডের বক্তব্য কী?

বাংলাদেশ সরকার সব সময় বলে আসছে পাকিস্তানি ও তার সহযোগীরা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এটি কি ঠিক? [তার ভাষায় এটি কি ‘ফেয়ার এস্টিমেট’?]

এটি মূল বক্তব্য এবং তারপর এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা ‘তথ্য প্রমাণ’ হাজির করেছেন। তার মতে, স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি এখনো স্পর্শকাতর। এ স্পর্শকাতরতার কারণ, জন্ম থেকেই একটি শিশু এ কথা শুনছে স্কুলে এটি পড়ানো হয়। দেশের কবিতা সংস্কৃতির বুননে তা ঢুকে গেছে। সুতরাং এ নিয়ে প্রশ্ন করা একটি গভীর বিশ্বাসকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

ডেভিডের মতে, যিনি এ কথা প্রথম বলেছেন তিনি এ দেশের স্বাধীনতার নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবে বাক্য বিন্যাসের কারণে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনাকে তার খুব একটা পছন্দ নয়। কারণ পরবর্তী বাক্যে লিখেছেন, এ সংখ্যাটি বেশি বলে আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকরা।

ডেভিড লিখেছেন, ১৯৭১ সাল নিয়ে রক্ষণশীল যে জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স তৈরি হয়েছে তা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ বা বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিপরীত। এমনকি, তার মতে এ সংখ্যা নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে অনেক আওয়ামী লীগার তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বা ‘অপজিশনাল মাইন্ডসেট’ বলে আখ্যা দেবে।

সুতরাং বাংলাদেশে ৩০ লাখ মৃতকে নিয়ে যে প্রশ্ন করবে তার মাথা নিচু করে থাকতে হবে, ভীত থাকতে হবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তিগত আক্রমণের আশঙ্কায়।

ডেভিড বার্গম্যানের এ বক্তব্য নিয়ে প্রথম আলোচনা করা যাবে। এটি ঠিক, আমাদের হৃদয়ে এবং ১৯৭১ সালের পর যাদের জন্ম তাদের মাথায় ৩০ লাখ শহীদ শব্দটি গেঁথে গেছে। কিন্তু এতে অস্বাভাবিক কী আছে? ডেভিডও নিশ্চয় বড় হয়েছেন ‘হলোকাস্ট’ শব্দটি শুনে। হলোকাস্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক ইহুদি ও নাজি বিরোধীদের নিধন হলো হলোকাস্ট। এটি বিশ্ববাসী বা ইউরোপীয়দের মধ্যে বিশ্বাস যে, ৩ থেকে ৬ কোটির বেশি মানুষ মারা গেছেন হলোকাস্টে। নাজি বা ফ্যাসিবিরোধী ডিসকোর্সের তা অন্তর্গত এবং ইউরোপের যে কোনো রাজনৈতিক দল হলোকাস্টের কথা বললে কি মনে হয় যে তা অর্থোডক্স ন্যাশনালিস্ট ডিসকোর্সের অংশ বা কোনো দলের বিশ্বাস? হ্যাঁ, হলোকাস্টে মৃতের সংখ্যা নিয়েও মাঝে মাঝে প্রশ্ন করা হয়েছে, কিন্তু যারা এ প্রশ্ন তুলেছেন তারা কি মেইনস্ট্রিম একাডেমিকসে জায়গা পেয়েছেন? এবং জার্মানিতে, যে জার্মান সরকার এক সময় এ নিধন চালিয়েছে, সে জার্মানিতে কেউ এ প্রশ্ন করলে কি তাকে জার্মান সমাজ গ্রহণ করবে? তাকে কি নাজি সমর্থক মনে করবে না? সে মনে করাটি কি ‘অপজিশনাল’ মাইন্ড সেট? আমেরিকাতে ইহুদি বিদ্বেষী দু’একজন লেখক এ নিয়ে কথা তুলেছেন এবং খোদ আমেরিকাতে তাদের নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে, হাসি ঠাট্টা করা হয়েছে তাদের ‘পাণ্ডিত্য’ নিয়ে। তারা পরিশীলিত তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের রিভিশনিস্ট বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষজন অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত, অতটা পরিশীলিত নয়, তাই যারা ৩০ লাখকে অস্বীকার করে তাদের হারামজাদা বলে। শব্দগত বা ভাবগত তফাৎ আর কি!

ডেভিড তার শ্বশুরের মতো আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে প্রশ্ন করলে কি শুধু আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়? না। ডেভিডের আওয়ামী লীগকে অপছন্দের কারণে মনে হয়েছে, খালি আওয়ামী লীগ-ই প্রতিক্রিয়া জানাবে। কমিউনিস্ট পার্টি তো ঘোর আওয়ামী লীগ বিরোধী। ডেভিড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, ৩০ লাখ শহীদে তিনি বিশ্বাস করেন কিনা? বিএনপি-জামায়াত ছাড়া আর কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন করে কিনা সেটি ডেভিড পর্যালোচনা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করবেন না দেখেই আগেভাগে জানিয়েছেন, এটি আমাদের সংস্কৃতির বুননে মিশে আছে। ডেভিড তার শ্বশুর ড. কামাল হোসেনকে একবার জিজ্ঞেস করলে পারতেন, তিনি এটা বিশ্বাস করেন কিনা? আওয়ামী লীগ করার সময় তো নিশ্চয় বিশ্বাস করতেন। না করলে কি প্রকাশ্যে তিনি তা বলবেন?

ডেভিডের নিবন্ধের প্রথম ভাগ দেখে মনে হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে আওয়ামী লীগ করছে সে জন্য তিনি খানিকটা কুপিত। ডেভিড তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি, আমরা সবাই এতে বিশ্বাস করতাম এখনো করি। ডেভিড এখন করেন না, তার বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে, আমাদের বিশ্বাস এখনো অটুট। ডেভিড কেন, আমাদের সবারই একটি বিষয় মনে রাখা উচিত, এ বিচারটা আওয়ামী লীগ না করলে তাদের অনেক নেতাকর্মী হয়তো খুশি হতেন। আওয়ামী লীগ সব সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছে কিন্তু প্রথম আমলে তা করেনি। ২০০৮ সালে, তারা জনগণের ম্যান্ডেট চেয়েছে বিচারে এবং তা পেয়েছে। তারপরও কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিচার কাজ শুরু হয়নি। পরে জনচাপে সেই ম্যান্ডেট আওয়ামী লীগ কার্যকর করছে মাত্র। এটি দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকরের মতো নয়।

নিবন্ধের দ্বিতীয়ভাগে ডেভিড বলছেন, সাংবাদিক বা গবেষকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ এই যে ‘আইকনিক ফিগার’ পর্যালোচনা করবেন। ডেভিড বুদ্ধিমান, পরের লাইনে লিখেছেন, এই পর্যালোচনা পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগীদের নিষ্ঠুরতা কম করে দেখানোর জন্য নয়। তার ভাষায়, This is not in order to minimize the extent of atrocities committed by the Pakistan military and its collaborators which were undoubtedly very significant, but for the purposes of a more accurate representation of history that is not thrall to partisan interest শেষ বাক্যটি লক্ষ্য করুন, ইতিহাসের স্বার্থে এবং যা পক্ষপাতমূলক স্বার্থের পক্ষে [পড়ুন আওয়ামী লীগ] যাবে না। অর্থাৎ ৩০ লাখ নিয়ে প্রশ্ন ওঠালেই তা আওয়ামী লীগের স্বার্থের বাইরে যাবে। এ ধরনের বাক্য গঠন দেখেই বোঝা যায় একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই লেখাটি রচিত হয়েছে- সেটি হচ্ছে অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠু নয়, অভিযোগগুলো বিশেষ করে হত্যার, সুষ্ঠু নয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

৩০ লাখ শহীদের ব্যাপারটি কীভাবে এল তারপর তা ব্যাখ্যা করেছেন ডেভিড। ১৯৭২ সালে ১৮ জানুয়ারি ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, , 3 million people have been killed, including children, women, intellectuals, peasants, workers, students…Õ ফ্রস্ট তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সংখ্যাটি যে ৩ মিলিয়ন তিনি তা কিভাবে বুঝলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি ফেরার আগেই আমার লোকজন তথ্য সংগ্রহ করেছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে খবরাখবরা আসছে, এখনো সঠিক সংখ্যায় উপনীত হইনি তবে তা কিন্তু ৩ মিলিয়নের নিচে হবে না।’ এর আগে ১০ জানুয়ারিও তিনি একই সংখ্যার কথা বলেছিলেন।

এরপর ডেভিড এ প্রসঙ্গে কট্টর মুজিব ও আওয়ামী লীগ বিরোধী মাহমুদুর রহমান মার্কা সাংবাদিক, বিবিসির এককালীন কর্মী সিরাজুর রহমানের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সিরাজ লিখেছেন, ৩ লাখকে শেখ মুজিব ইংরেজিতে ৩ মিলিয়ন বলেছেন। সিরাজ এ মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুর ইংরেজি জ্ঞানের প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছেন। সিরাজুর রহমানের বই পড়েছি। ইংরেজি নিশ্চয় ভালো জানেন লন্ডনে থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধুর ইংরেজি ভাষণও পড়েছি। সিরাজুর রহমানের ইংরেজি এর চেয়ে উত্তম এমন দাবি করা যায় না। বাংলা গদ্য তো নয়ই। সিরাজুর রহমানের যে দৃষ্টিভঙ্গি তাতে তিন লাখও তার কাছে বেশি মনে হওয়া স্বাভাবিক। সংখ্যাটি ৩০ হাজার হলে বোধহয় তিনি সন্তুষ্ট হতেন।

এস এ করিমের প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকেও ডেভিড উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনিও লিখেছেন, ৩০ লাখ Ôno doubt a gross exaggeration । এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, প্রাভদায় সংবাদটি ছাপা হয়েছিল।

বার্গম্যান বলেছেন, প্রাভদার হিসেবটা গোলমেলে [কমিউনিস্টদের কাগজ সেজন্য; ইহুদি বা ইউরোপীয়দের হলে না হয় মানা যেত।] কারণ প্রাভদা লিখেছিল, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে [days immediately] ৮০০ বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল। আসলে ঠিক সংখ্যা হবে ২০।

বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ থেকে। এই বুদ্ধিজীবীর অন্তর্গত [দেখুন রশীদ হায়দার সম্পাদিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ] বিভিন্ন পেশার মানুষ। ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২০ জন বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে? জামায়াতীদের কাছেও অপমানজনক মনে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে সামান্য একটু প্রশংসা করেছেন ডেভিড। ফ্রস্টের সাক্ষাৎকারের পরপরই তিনি দুটি কমিটি করেছিলেন মৃতের সংখ্যা জানার জন্য। কমিটি নাকি প্রাথমিক রিপোর্টও দিয়েছিল। সে রিপোর্টে নাকি ৫৭,০০০ জন মৃতের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। সে জন্য এরপর সরকার এ নিয়ে এগোয়নি। প্রশ্ন জাগে, নিয়াজি যে ১৫ লাখের কথা বলেছিলেন সেটি কী কারণে?

এরপর ডেভিড কলেরা হাসপাতাল, যা এখন আইসিডিডিআরবি নামে পরিচিত তাদের একটি জরিপের উল্লেখ করেছেন। মতলব থানা নিয়ে জরিপটি পরিচালিত হয়েছিল। ওই থানায় তাদের অনুমান ৮৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই হিসাবে মৃতের সংখ্যা তারা ৫ লাখ বলে অনুমান করেছে। ২০০৮ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল অনুসারে, ১৯৭১ সালে নিহতের সংখ্যা ১,২৫,০০০ থেকে ৫,০৫,০০০ জন। আর জে রুমেল বলছেন ১৫ লাখ আর শর্মিলা বোসের হিসাব অনুযায়ী ৫০ হাজার ১০০,০০০।

এ রকম আরো কিছু হিসাব দিয়েছেন তিনি। উপসংহারে তিনি লিখেছেন, যে কোনো সংঘাতে নিহতের সংখ্যা নিরূপণ করা মুশকিলÑ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য এর ‘পার্টিজান পলিটিকসের’ কারণে। এবং এ কারণে এ বিষয়ে স্বাধীন গবেষণা করা কঠিন। এটা ঠিক পাকিস্তানিরা অনেক হত্যা করেছে। মৃতের সংখ্যা যাই হোক সরকারের বর্তমান নীতি যে অপরাধীর বিচার তাতে [এ সংখ্যা] কোনো অভিঘাত হানবে না। তার ভাষায়-ÔThis is pity- as the number of civilians who were killed in atrocities by the Pakistan military in 1971 was, without doubt, very high. Whatever might be the actual figure, it would not affect the government’s current policy for the need for criminal accountability for these offences.

বার্গম্যান যে সব যুক্তি দিয়েছেন এগুলো যে খুব নতুন তা নয়। আমরা এর বিপরীতে যেসব যুক্তি দেব তাও নতুন নয়। রবার্ট পেইন সেই ১৯৭২ সালে যেমন ম্যাসাকারে লিখেছেনÑ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘৩০ লাখ হত্যা করো, বাকিরা আমাদের হাত থেকে খাবার খুটে খাবে।’ এখন যদি বলি সামরিক বাহিনীর প্রধানের আদেশ তার সৈন্যরা মেনে ৩০ লাখ হত্যা করেছে তাহলে এ যুক্তি অসার এমন কথা কি বলা যাবে? প্রাভদা ইয়াহিয়ার কথার আলোকেও এই সংখ্যা উল্লেখ করে থাকতে পারে।

মুক্তমনা ওয়েবসাইটে আবুল কাসেম একটি প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার জরিপে লেখা হয়েছে, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১২ হাজার মানুষ মারা হয়েছে। গণহত্যার ইতিহাসে এই হার সবচেয়ে বেশি।

[Among the genocides of human history, the highest number of people killed in lower span of time is in Bangladesh in 1971. An average of 6000 (six thousand) to 12000 (twelve thousand) people were killed every single day… This is the highest daily average in the history of genocides.]

জাতিসংঘের হিসাব ধরে আবুল কাসেম একটি হিসাব করেছেন। তার মতে হত্যা হয়েছে ২৬০ দিন। সে হিসাবে জাতিসংঘের সর্বনিম্ন হিসাব ধরলে তা দাঁড়ায় ৬০০০ী২৬০ = ১৫৬০০০০ বা ১৫ লাখ ৬০ হাজার। আর সর্বোচ্চ মাত্রা ধরলে =১২০০০ী২৬০ = ৩১২০০০০ বা ৩১ লাখ ২০ হাজার। তার মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ৪০% পরিবারের কেউ না কেউ মারা গেছেন এবং পাকিস্তানি প্রতিটি সৈন্য প্রতি ১০ দিনে ১ জন করে হত্যা করেছে। এখানে রাজাকার, আলবদর কর্তৃক হত্যার সংখ্যা ধরা হয়নি।

পাকিস্তানি সেনা অফিসার কর্নেল নাদের আলী যিনি ১৯৭১ সালে এখানে ছিলেন এবং গণহত্যা করে ও দেখে সাময়িকভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। লিখেছেন, তাকে আদেশ দেয়া হয়েছিল ‘মুজিবের জেলায় [হোম ডিস্ট্রিক্ট] যত বেজন্মাকে পাওয়া যায় তাদের হত্যা করো এবং কোনো হিন্দু যেন বাদ না যায়।’ এ ধরনের আদেশ যখন দেয়া হয় তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা কী পরিমাণ হত্যা করতে পারে তা অনুমেয়।

এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে গিয়েছিলেন বাদ্য হয়ে। সীমান্ত অতিক্রম করার সময় এবং শরণার্থী শিবিরে কত মানুষ মারা গেছেন সে হিসাব কিন্তু গণহত্যার অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। সে হিসাবও কিন্তু গণহত্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। এ রকম অনেক তথ্য উপাত্ত ৩০ লাখ শহীদের পক্ষে দেয়া যায় কিন্তু আমি দেব না। কারণ এগুলো কুতর্ক। বিশেষ উদ্দেশ্যে এসব বিতর্ক উত্থাপন করা হয়। বলতে পারেন তাহলে আমি বিতর্কে যোগ দিচ্ছি কেন? না, যোগ দিতে চাইনি। কিন্তু বার্গম্যানের লেখা পড়ে অনেকে অনুরোধ করেছেন কিছু লিখতে এ কারণে যে, তাহলে বার্গম্যানরা একই কথা বার বার বলবে। পুরনোরা না হোক, নতুনদের অনেকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। অন্তত, তাদের যুক্তি যে উদ্দেশ্যমূলক এ বক্তব্যটি আসা উচিত।

বার্গম্যানরা এসব দেখাদেখির পর আমাদের প্রস্তাবিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার অপরাধ সংক্রান্ত আইন নিয়ে আলোচনার জন্য আমাকে ফোন করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, পরস্পর সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিষ্কার। তিনি আমাদের গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি আশা করব, বার্লিন বা তেলআবিবে গিয়ে বলুন হলোকাস্ট হয়নি। সে কথা যেদিন বলবেন, তারপর দিনই আমরা আলোচনা করব। বলাবাহুল্য এর কোনো উত্তর ছিল না।

গণহত্যা নিয়ে জনকণ্ঠে আমি কিছুদিন আগে দীর্ঘ লেখা লিখেছি। ওই প্রবন্ধের সব বিষয়ের অবতারণা করব না, কিছু বিষয় তুলে ধরব বর্তমান নিবন্ধে সম্পূর্ণতা দেয়ার জন্য।

কোনো গণহত্যারই নির্দিষ্ট সংখ্যা কখনো নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব গণহত্যার সংখ্যা দেয়া হয়েছে তার সবগুলোই আনুমানিক। এই অনুমানের ভিত্তি প্রত্যক্ষভাবে দেখা, বিভিন্ন প্রতিবেদন, অভিজ্ঞতা। যে দেশ-জাতি গণহত্যার যে সংখ্যা নিরূপণ করে তা মোটামুটি এ কারণে মেনে নেয়া হয়।

ফতে মোল্লা যেমন লিখেছেন, সংখ্যা একেবারে সঠিক হবে এমন কথা বলা যাবে না, মূল বিষয় হচ্ছে সংখ্যা আমরা ব্যবহার করি গণহত্যাটি বোঝার জন্য (to address the issue of genocide) তার ভাষায়, ÔAll numbers are not absolute we do use arbitrary numbers extensively all the time in our lives.Õ

কম্বোডিয়া থেকে রুয়ান্ডা বা হলোকাস্ট থেকে ইন্দোনেশিয়া কোথায় চুলচেরা হিসাব দেয়া হয়েছে? সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ায় যে গণহত্যা চালিয়েছিলেন ১৯৬৫-৬৬ সালে, তাতে অনুমান করা হয় ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সেটি মানা না মানা অন্য কথা, কিন্তু সুহার্তো কী পরিমাণ হত্যা করেছিলেন সেটিই মূল বিষয়। ধরা যাক, কেউ বললেন বাংলাদেশে ২৯ লাখ ৯০ হাজার ৫১৯ জন মারা গেছেন। তাতে কি আসে যায়?

সংখ্যার নির্দিষ্টকরণের পেছনে এক ধনের রাজনীতি আছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে নাপাম দিয়ে যে গণহত্যা চালিয়েছে সেটিকে পাশ্চাত্যের কেউ গণহত্যা বলেন না, বলেন যুদ্ধ। কারণ যুদ্ধ বললে হত্যার দায় হ্রাস পায়। দু’পক্ষে যুদ্ধ হলে তো মারা যাবেই। কিন্তু ভিয়েতনামে কি খালি যুদ্ধ হয়েছিল? নিরীহ সিভিলিয়ানদের হত্যা করা হয়নি বছরের পর বছর? সুহার্তোর হত্যা নিয়ে কখনো কথা বলা হয় না। ওই গণহত্যা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চিন্তা করা হয়েছে, কেউ এ বিষয়ে কথা বলেন না, কারণ কাজটি আমেরিকার সাহায্যে করা হয়েছে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্ব সোচ্চার কারণ, পলপট ছিলেন কম্বোডিয়ার এবং মার্কিন বিরোধী। কমিউনিস্ট শাসন যে কত খারাপ তা বোঝানোর জন্য কম্বোডিয়ার কথা বারবার আসে। বাংলাদেশে গণহত্যার ৩০ লাখ শহীদকে নিয়ে এতদিন কোনো প্রশ্ন ওঠানো হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে গণহত্যার চেয়েও বিচার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বার্গম্যান বা ক্যাডমান বা অন্য কেউ। কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। গত নির্বাচনের পর থেকেই হঠাৎ গণহত্যার বিষয়টি তোলা হচ্ছে। এখানে আরো মনে রাখা উচিত, আমেরিকা এই নির্বাচন সমর্থন করেনি। হঠাৎ গত একমাস ধরে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারেক রহমান, খালেদা জিয়া প্রশ্ন তুলছেন। গণহত্যায় যে ৩০ লাখ শহীদ হয়নি সে কথা খালেদা জিয়া প্রথম বলেছেন যা আগে কখনো বলেননি। এখন ডেভিড বার্গম্যান বিদেশের কাগজে এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তানিরা তুলছে। এগুলো কি কাকতলীয়? মোটেই না। এর পেছনে অন্য রাজনীতি আছে। বাংলাদেশে কেন গণহত্যার বিষয়টি এতদিন চাপা পড়ে গিয়েছিল? এর একটি কারণ আমরা নিজে, অন্য কারণ, আমেরিকা, পাকিস্তান, সৌদি আরব বা চীনের দৃষ্টিভঙ্গি।

এ কথা বলা অন্যায় হবে না, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং মিডিয়া মুক্তিযুদ্ধকে সজীব রেখেছিল। তিন দশক তাদের নিরলস কর্মপ্রচেষ্টার ফল আজ পাওয়া যাচ্ছে। বৈরি পরিবেশেও তো আমরা মুক্তিযুদ্ধের কাজ করেছি। আজ কি অস্বীকার করা যাবে, নতুন জেনারেশন এখন অনেক সজাগ মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে। যখন আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলতাম, অনেকেই আমাদের টিটকারি দিত। এ ধারাটি ছিল একেবারে ক্ষীণ। এখন কি অস্বীকার করাতে পারবেন যে এই ধারা এখন স্ফীত। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া সারাদেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলব আমাদের রাজনীতিটাও স্পষ্ট করতে হবে। আমাদের পরিষ্কার ভাষায় বলতে হবে যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না তারা পাকিস্তানমনা। তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তাদের রাজনীতি অপরাজনীতি। দেশের ক্ষমতা কিছুতেই তাদের হাতে হস্তান্তরিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আপসের সংস্কৃতি বিসর্জন দেয়াই বিধেয়।

মুক্তিযুদ্ধের জন্য শেখ হাসিনাই সবচেয়ে বেশি করেছেন এ কথাটাও মুক্তভাবে বলতে হবে। মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক তৈরি, মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারদের ভাতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তিনিই বেশি দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বঙ্গবন্ধু করতে পারেননি কিন্তু তার কন্যা সেটা করে দেখার সাহস দেখিয়েছেন। তখন বিদেশি যারা মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করেছিলেন তাদের সম্মাননা দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। ব্যক্তি উদ্যোগে যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে উঠেছিল তা স্থায়ী ভবনে স্থানান্তরে শ’কোটির টাকার বেশি সাহায্য করেছেন শেখ হাসিনা। আমরা কয়েকজন খুলনায় যখন ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলাম তখন তিনি একটি ছোট বাড়িসহ খানিকটা জমি দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে তার কাছে গিয়ে কেউ ফেরত এসেছে শুনিনি। কিন্তু একই সঙ্গে আমার মনে হয়েছে আমলাতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধ-বান্ধব নয়।

প্রশ্ন হলো সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে কেন? আমরা যার যার অবস্থান থেকে তো কাজ করতে পারি। আমরা ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের জন্য আন্দোলন করেছি। এখন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন তা পালিত হবে। তবে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কিছু কাজ প্রয়োজন। যেমন-

১. পাকিস্তানে বা অন্য কোনো দেশে সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধ বা গণহত্যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে সরকারের কঠোরভাবে তা প্রতিবাদ করা উচিত যা আগে করা হয়নি তেমনভাবে। জুনায়েদের বই নিয়ে এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ সরকারিভাবে নেয়া হয়নি।

২. মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল অটুট রাখা। এবং যেখানে তা হচ্ছে সেই ইমারতটিকে গণহত্যা জাদুঘরে পরিণত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ।

৩. গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সারাদেশে যেসব উদ্যোগ বেসরকারিভাবে নেয়া হয়েছে সেগুলোকে সহায়তা করা।

৪. জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করা। এ সংক্রান্ত আইন তৈরি হয়েছে কিন্তু সরকার তা এখনো আমলে নিচ্ছে না।

৫. মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার নিয়ে বা গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে শাস্তির সম্মুখীন করা। এ সংক্রান্ত আইনও প্রস্তুত করেছে ল’কমিশন কিন্তু সরকার তা আমলে নিচ্ছে না।

৬. কয়েক বছর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থান সংরক্ষণে যে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট তা বাস্তবায়ন করা। হাইকোর্টের সেই মাইলফলক রায় দিয়েছিলেন বর্তমান ল’কমিশনের প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ও প্রেস ইনস্টিটিউটের সভাপতি বিচারপতি মমতাজউদ্দীন।

৭. ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ ডাকবিভাগকে প্রস্তাব দিয়েছিল গণহত্যা সংক্রান্ত ৭১টি ডাকটিকেট প্রকাশ করার। দেশে-বিদেশে গণহত্যার স্বীকৃতির বিষয়ে এটি অন্যতম হাতিয়ার। প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মতি দিয়েছেন। ২৫ মার্চ যেন তা সাড়ম্বরে প্রকাশিত হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন তা স্থগিত হয়ে না যায়।

৮. আরো কয়েক বছর আগে যদি সরকারিভাবে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালিত হতো তাহলে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো ২৫ মার্চও আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষিত হত্যা। কিন্তু জাতিসংঘ ইতোমধ্যে ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং এখন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য কাজ করতে হবে। এজন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে [অর্থাৎ সংসদে বা সরকার যদি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেয়] এই গণহত্যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না।

৯. জানা গেছে, জুনায়েদ আহমদের কনসালটিং ফার্ম এখানে জলবায়ু প্রকল্পে কাজ পেয়েছে বা ওই ফার্মের কেউ কেউ এখানে কাজ করছেন। যদি এটি সত্য নয় তাহলে তাদের বহিষ্কার করা।

১০. ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস যাতে উপজেলা পর্যায়ে পালিত হয় তার ব্যবস্থা করা। মুক্তিযুদ্ধ সজীব রাখতে সরকারকে সব করতে হবে তা নয়। বিজয় দিবস এলে কি দেখেননি, সারাদেশে রাস্তায় রাস্তায় পতাকা বিক্রি হয় হু হু করে। রিকশাওয়ালা থেকে গাড়িওয়ালা সবাই রিকশা বা গাড়ির স্ট্যান্ডে একটি পতাকা লাগায়। অনেকে ছাদে ওড়ায়, তরুণরা মাথায় ব্যান্ড বাঁধে। মুক্তিযুদ্ধের ফ্যাশন [মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাপড়ের ফ্যাশন] নিয়ে মেতে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের জমিন এখনো উর্বর। ফসল বুনতে পারলেই হয়। এর অর্থ, আমরা যে যার পেশায় আছি, যে যেই এলাকায় আছি যদি একটু উদ্যোগ নেই ছোট ছোট কাজগুলো করার, তা হলেই তা বিরাট কর্মযজ্ঞে পরিণত হবে। শুধু একটু ইচ্ছা। একটু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

মুক্তিযুদ্ধ যখন হয় তখন যৌবনে পা দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ যখন মৃতপ্রায় তখন মধ্য যৌবনে। আমাদের জেনারেশন সেই মুক্তিযুদ্ধ সজীব করার জন্য চেষ্টা করেছি। আজ প্রৌঢ়ত্বে পড়ে অনুধাবন করছি, বিজয়ী হয়েও হয়তো অনেক কিছু করতে পারিনি কিন্তু একেবারে কিছু করতে পারিনি তা নয় বা সব কিছুই বৃথা যায়নি। বৃথা যায় না। একটি জেনারেশন তৈরি হয়েছে। আমাদের আরাধ্য কাজ হয়তো তারা এগিয়ে নেবে।

আমাদের সব জানালা খোলা রেখেছি। আমরা বিজয়ের গান শুনব। বিজয়ীরা কখনো পরাজিতের গান শোনে না। পরাজিতের সঙ্গে হাত মেলায় না। বিজয়ীরা বিজয়ী থাকব থাকবে, এবং ক্রমান্বয়ে খালি বিজয়ের গানই রচিত হবে।

  • আলোচ্য প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধু’ (২০২১) গ্রন্থ থেকে। উল্লেখ্য, প্রবন্ধটি ২০১৭ সালে গণহত্যা জাদুঘর আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত হয়। 

Post a comment