Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

মুনতাসীর মামুনের বঙ্গবন্ধু চর্চা ।। ড. মো. মাহবুবর রহমান

  • ড. মো. মাহবুবর রহমান

১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনার মূর্ত প্রতীক মুনতাসীর মামুন বিস্মৃতপ্রায় মুক্তিযুদ্ধকে জনপ্রিয় করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চর্চা শুরু করেন। পাশাপাশি শুরু করেন বঙ্গবন্ধু চর্চা। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মুনতাসীর মামুন প্রথমে পত্র-পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালিখি শুরু করেন। তবে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে ‘ইতিহাসের আলোয় শেখ মুজিবুর রহমান’ শিরোনামে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা শুরু করার পর তিনি উপলব্ধি করেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত খুবই কম। ১৯৭২ থেকে যেসব গ্রন্থ-প্রবন্ধ রচিত হয়েছে তা কোন এক জায়গায় সংগৃহীত হয়নি। সেগুলো ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আওয়ামী লীগের কোন আরকাইভস না থাকায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোন উপকরণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত কোন লিফলেট, পোস্টার, স্মরণিকা, বার্ষিকী, চিঠিপত্র ইত্যাদি কিছুই সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর কোন ভাষণ তখন পর্যন্ত সংকলিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোন চর্চা কেন্দ্র বা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা কেউ ভাবেনি। সত্য বলতে কি, উপকরণের অভাবেই কেউ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে গবেষণায় আগ্রহী হননি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের বাইরে কয়েকটি পিএইচডি গবেষণা হলেও তা ছিল অপ্রকাশিত কিংবা গবেষকদের নাগালের বাইরে। এমনি পরিস্থিতিতে মুনতাসীর মামুন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে উপকরণ অনুসন্ধান করা শুরু করেন। তিনি যথার্থই চিন্তা করেছিলেন যে, ১৯৭০-৭৫ সময়কালের পত্র-পত্রিকা হতে পারে বঙ্গবন্ধুর তথ্য ভান্ডার। সে লক্ষ্যে তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাতটি দৈনিকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাবতীয় প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ইত্যাদির শিরোনাম বিষয়ভিত্তিক পঞ্জি আকারে সংকলিত করে ২০০৪ সালে প্রকাশ করেন দুই খণ্ডে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গ্রন্থ। এটি বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে প্রথম প্রকাশিত একটি পঞ্জি। দুই খণ্ডে ১২১৩ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে ১৬,৭৯৩টি ভুক্তি আছে। ভুক্তিগুলো দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ঘটনাবলীর বিবরণ ও দ্বিতীয় পর্বে সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় ও অন্যান্য বিষয়।

দুই খণ্ডে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শিরোনামের গ্রন্থ থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবনের ১৯৭০-৭৫ সময়কালের পরিচয় পাওয়া যাবে। বর্তমানে গ্রন্থটি তথ্যের আকর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মুনতাসীর মামুনের পরবর্তী গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। এরপর তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নিয়মিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রবন্ধ প্রকাশও অব্যাহত রেখেছেন।

এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মুনতাসীর মামুন ১৮টি গ্রন্থ এবং প্রায় ৩০টি প্রবন্ধ লিখেছেন। গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করা ছাড়াও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি ১৯৯৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করেছিলেন। এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল ‘নিয়মিত বক্তৃতার আয়োজন, জার্নাল প্রকাশ, উচ্চতর গবেষণার আয়োজন ইত্যাদি। এই ইনস্টিটিউটটি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের পর তা আবার সচল হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখ তা হয়নি।

তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’ (ওঈইঝ)। এখান থেকে ‘বাংলাদেশ চর্চা’ নামক ১৬ খণ্ড প্রকাশনা বের করেছেন। এর মাধ্যমেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ চর্চার প্রথম সংখ্যায় ‘রেহমান সোবহান রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ (বাংলাদেশ চর্চা, ২০০১, পৃ. ১৭-৩৯) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

মুনতাসীর মামুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন।

মুনতাসীর মামুন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মেলনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘ইতিহাস সম্মিলনী প্রবন্ধ সংগ্রহ’ নামক জার্নালে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে।

মুনতাসীর মামুনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের উপর সিরিজ গ্রন্থমালা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা বিষয় নিয়ে ২২টি গ্রন্থ রচনা করা হয়। মুনতাসীর মামুন এর অধিকাংশ সম্পাদনা করেন। গ্রন্থমালা সিরিজের অন্যতম প্রকাশনা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কোষ। এ কোষগ্রন্থের পরিকল্পনা ও সম্পাদনা করেছেন মুনতাসীর মামুন। কোষগ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের সার্বিক পরিচয় সংকলিত হয়েছে। শিশু একাডেমী থেকে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত ২২টি গ্রন্থের মধ্যে ৫টি গ্রন্থ লিখেছেন বা সম্পাদনা করেছেন মুনতাসীর মামুন।

মুনতাসীর মামুন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী প্রতিবছর বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একক বক্তৃতার আয়োজন করে এবং বক্তৃতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা বা লেখালেখিতে প্রাথমিক উপাদান হিসেবে মুনতাসীর মামুনের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫১ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্মগ্রহণ করা মুনতাসীর মামুন বেড়ে উঠেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির আন্দোলন সংগ্রাম দেখতে দেখতে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত তিনি কৈশর অবস্থা অতিক্রম করে টগবগে যুবক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। ১৯৭২ সালে ডাকসুর সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭২ থেকে বিচিত্রায় সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করেছেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর তাঁর শাসনকাল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন মুনতাসীর মামুন। বলা যায়, পর্দার অন্তরালে ঘটে যাওয়া অনেক কাহিনীই তাঁর জানা। মুনতাসীর মামুনের স্মরণশক্তি প্রখর। তাই তিনি যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখেন তখন তাঁর মনের মেমোরি কার্ড থেকেই তিনি তথ্য পেয়ে যান। তাঁর কাজ সহজ হয় যখন শেখ হাসিনার কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২), কারাগারের রোজনামচা (২০১৭)গোয়েন্দা প্রতিবেদন (সিক্রেট ডকুমেন্টস) (২০১৮ থেকে) প্রকাশিত হয়। প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে কয়েক খণ্ডে বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত সংবাদপত্রের সংকলন প্রকাশিত হলে (২০১৫) মুনতাসীর মামুনের বঙ্গবন্ধু চর্চার গতি বেড়ে যায়। তাইতো দেখি ২০০৯ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর মাত্র ৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও ২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। ২০২০ সালেই তিনি ৪টি গ্রন্থ লিখেছেন।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মুনতাসীর মামুনের সকল লেখাই গবেষণাধর্মী। তিনি সম্ভাব্য সকল উৎস থেকে তথ্য, উপাত্ত, উপকরণ ও উপাদান সংগ্রহ করে তাঁর বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন। তাঁর সকল লেখাই বিশ্লেষণ ধর্মী। তাঁর গ্রন্থ ও প্রবন্ধ অন্য গবেষকদের জন্য তথ্য ভাণ্ডার। তিনি সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষাতেই লেখেন। সহজেই তাঁর বক্তব্য বোঝা যায়।

তিনি একাই মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে পরিমাণ মৌলিক গবেষণা করেছেন, আর কেউ তাঁর ধারে কাছেও নেই।

মুনতাসীর মামুন ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যেসব গ্রন্থ ও প্রবন্ধ লিখেছেন তা থেকে বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক জীবনের একটি চিত্র পাওয়া যায়। আমরা মূল প্রবন্ধে আলোচনা করেছি।

মুনতাসীর মামুন বঙ্গবন্ধুর ভাল কাজের প্রশংসা করেছেন, সমর্থন করেছেন- আবার কোন কোন কাজের সমালোচনা করেছেন। আবার প্রচলিত অনেক সমালোচনাকে যুক্তি দিয়ে খ-ন করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মুনতাসীর মামুনের কয়েকটি উক্তি :

ভাল লাগুক আর না লাগুক তাঁকে স্বাধীনতার স্থপতি বলা ছাড়া উপায় কি? আর শেখ মুজিব ১৯৭০ সালে হঠাৎ ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ১৯৭২ সালে ‘জাতির জনক’ হয়ে গেলেন, তাও নয়। বঙ্গবন্ধু হতে সময় লেগেছে তার তিন দশক।’

‘শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিল কয়েকটি কারণে- তা হলো হৃদয়ের ব্যপ্তি, মানবতা এবং সহিষ্ণুতা। তাঁর চলাফেরা, পোশাক-আশাক, কথাবার্তা সবকিছুর মধ্যে ছিল সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বন্ধন অটুট রাখার ইচ্ছা।’

শেখ মুজিব কি ছিলেন তা প্রায় তিন দশক পর বাংলাদেশের মানুষ আবার অনুভব করেছে। কেন তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি পেয়েছিলেন তা আজ মানুষ বুঝতে পারছে। শেখ মুজিব আজীবন বাঙালির স্বার্থে কাজ করেছেন এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আপস করেননি। আবহমান সাধারণ বাঙালির মতই তাঁর ছিল জীবনচর্যা। সব সময় তাঁর যোগ ছিল সাধারণ মানুষ ও সম্প্রদায়ের সাথে। সাধারণ বাঙালির সব বৈশিষ্ট্যই তিনি ধারণ করেছিলেন। দেশের মানুষ ও দেশের প্রতি তাঁর ছিল অন্ধ ভালবাসা। তিনি বলতেন যে ‘আমার শক্তি এই যে আমি মানুষকে ভালবাসি’। এসব কারণে বাঙালি ভালবেসে তাঁর নাম দিয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং আবেগে ‘জাতির পিতা’।

তাঁকে বাদ দিয়ে প্রাক ও উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা অসম্ভব। মুনতাসীর মামুনের ভাষায় : বঙ্গবন্ধু ‘বাঙালির অনেক বছরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন, সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিলেন এ জাতির জন্য স্বাধীন এক ভূখণ্ডের, যার নাম বাংলাদেশ’।

  • লেখক: প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Post a comment