Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

ফটো এ্যালবাম: ‘The most important thing I have’

 

নোট: নিজভূমে জেনোসাইডের শিকার এবং পরভূমে আশা-নিরাশার দোলাচলে থাকা রোহিঙ্গাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনটা জিনিসটা তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান, বা গুরুত্বপূর্ণ বা দরকারি। মায়নমার থেকে যখন পালিয়ে আসেন তখন কোন গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। ১১জন রোহিঙ্গা তাদের মূল্যবান জিনিসটার কথা জানিয়েছিলেন, এই জানানোর মাধ্যমে তাদের হাহাকার, ঘরবাড়ি-আত্মীয় স্বজন হারানো বেদনা, নির্যাতনের করুণ স্মৃতি, আগামীর স্বপ্ন সবকিছু ফুটে উঠেছিল। তাদের কথাগুলো ২০১৮ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকা প্রকাশ করেছিল। (‘The most important thing I have’: Rohingya refugees on what they most value – in pictures)। প্রতিটি ছবির ক্যাপশনে তাদের কথাগুলোও যুক্ত করা হয়েছে।
বি: দ্র: গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে অধিকাংশের নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।

আক্রমণকারীরা যখন গ্রামে আক্রমণ করে তখন ৬০ বছর বয়সী হাফজা বাড়ির বাইরে ছিলেন। তার বাচ্চাদের জন্য আর্তনাদ করার এবং একটি সোলার প্যানেল ধরার সময়টুকুই কেবল পেয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমি যদি আরো কোনো কিছু নেয়ার জন্য একটা মিনিটও সময় পেতাম তাহলে আমাদের টাকা নিয়ে আসতাম। আরো বলছিলেন, ‘সোলারটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ যখন রাত নামে তখন এই আলোই আমাকে প্রার্থনা ও রান্না করতে সাহায্য করে। যখন আলো জ্বলে উঠে আমি খুব নিরাপদ বোধ করি। আমি আমার জমিজমা, টাকাপয়সা, এবং ঘরবাড়ি সব হারিয়েছি, তবু তাতে কিছু যায় আসে না। আমার কাছে এখনো আমার স্বামী ও সন্তানেরা রয়েছে। অনেকে তো এতটাও ভাগ্যবান ছিল না।

 

৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ তার পরিবারের সাথে দক্ষিণ বাংলাদেশের একটি শিবিরে থাকেন। তার কাছে তার মূল্যবান জিনিসটি হচ্ছে মায়ানমারে তার জমিজমার দলিলাদি। এই দলিলগুলোই প্রমাণ করে যে তিনি জমিগুলোর মালিক। তিনি বলেন, ‘আমরা ফিরে যাব এবং পুনর্নির্মাণ করব এবং আবার উত্পাদনশীল হব। ‘আমি যদি মায়ানমারে ফিরে যাই এবং আমার জমিগুলো কোথায় তা প্রমাণ করতে হয় তখন এই দলিলগুলো সহায়তা করবে।’ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া হলেই কেবল তিনি ফিরে যাবেন।

 

শাহিনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি প্রসাধনী সামগ্রী ভরা নীল কাপড়ের ব্যাগ। এখানে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী পাঁচ বছর বয়সী এই বালিকা তাঁর আট বছর বয়সী বোন রাবিয়ারস সাথে শিবিরের সামনে পোজ দিচ্ছে।

 

নূর ধর্ষণের শিকার ও নৃশংসভাবে মারধরের শিকার অসংখ্য মানুষকে শশ্রুষা করেছেন। মায়ানমারে, সরকার রোহিঙ্গাদেরকে ডাক্তার হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের অনুমতি দেয় না, কিন্তু নূর বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি বহুবার গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং প্রায়শই তাঁকে জরিমানা করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের আগস্টে তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে পালাতে হবে। নূর পালানোর সময় একমাত্র যে জিনিসটি নিয়ে আসতে পেরেছিলেন তা হচ্ছে তাঁর পরিহিত লুঙ্গি। তিনি বলছিলেন ‘আমি যখন এটি দেখি তখন আমি আমার দেশ, আমার বাড়ি, আমার আগের জীবন সব মিস করি। আমি যখন মায়ানমারে ফিরে যাবো এই লুঙ্গিটাই পরব।’

 

২৬ বছর‍ বয়সী মোহাম্মদ তাঁর গ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন। মোহাম্মদ বাংলাদেশে আসার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা নিয়ে এসেছেন তা হচ্ছে তাঁর শিক্ষাগত সার্টিফিকেটগুলো। দেশে ফিরে গেলে যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির জন্য এগুলো দরকারি। তিনি বলছিলেন, ‘এখানে আমার ভালো লাগছে না। মায়ানমারে আমার একটা বড় বাড়ি ছিল, পরিষ্কার পানি ছিল এবং একটা ভালো চাকরি ছিল। আমি ফিরে যেতে চাই, কিন্তু আমাদের নাগরিকত্ব না দেয়া পর্যন্ত আমরা যাব না।’

 

কলিমা বলছিলেন যে, মায়ানমারে তাঁর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এরপরে আর কিছুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০ বছর বয়সী কলিমা বলছিলেন, ‘আমি জানি না, আল্লাহ কেনো আমাকে মরতে দেন নি’। তাঁর গ্রামে যখন আক্রমণ করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, মানুষের উপর গুলি ছোড়া হচ্ছে, তিনি তখন মাত্র তিন মাসের বিবাহিতা। কলিমার স্বামী ও ছোট বোন গুলিতেই মৃত্যু বরণ করেন। কয়েকজন পুরুষ এরপর তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং ধর্ষণ করে, একসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি তাঁর চাচা ও কাজিনের সাথে বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন। কলিমা এককালে দর্জি ছিলেন, এবং আবারো সেলাইয়ের কাজ করতে চান।

 

 

পনেরো বছর বয়সী জামিরের প্রিয় জিনিস হচ্ছে তাঁর কুকুর, নাম শিকারী। সে বলছিল, ‘শিকারী হল মায়ানমার থেকে আসা আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, কারণ সে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু এবং আমার রক্ষক। ‘আমি যদি কোনো সমস্যায় পড়ি, হয়তোবা কেউ আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না, কিন্তু শিকারী সবসময় আসবে’। জামিরের পরিবার মায়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে ২৮ বছর আগে, এবং একটি স্থায়ী শিবিরে তার জন্ম। সে কুকুরটিকে প্রথম গত শরতে দেখেছিল, মায়ানমার থেকে শরণার্থীদের অনুসরণ করে বাংলাদেশে চলে এসেছিল।

 

 

মায়ানমার থেকে পালানোর সময় নুরাস তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন তা হচ্ছে এই ছবির বাচ্চাটি। তাঁর গ্রামে আক্রমণের পর তিনি যখন পালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন এই শিশুকে কুড়িয়ে পান। ২৫ বছর বয়সী নুরাস ও তাঁর চার শিশু যখন পালাচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পান, এবং দুইজন রোহিঙ্গা লোকের দেহের পাশে খুঁজে পান। তিনি বাচ্চাটির পরিবারের খোঁজ করেন, কিন্তু খুঁজে না পেয়ে তিনি ও তাঁর স্বামী বাচ্চাটির নাম মোহাম্মদ হাসান রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

 

১০২ বছর বয়সী ওমর অন্ধ। তিনি বলছিলেন যে, দেশ ত্যাগের সময় তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হচ্ছে তাঁর লাঠি। ‘যদি আমার এই লাঠি না থাকতো, তবে হামাগুড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে হতো’। পাশের গ্রামে আক্রমণ হওয়ার পর ওমর ও উনার সহযোগীরা পালানো শুরু করেন। ওমর অন্যান্য শরণার্থীদের কণ্ঠস্বর অনুসরণ করেন। তিনি বলছিলেন যে, এই চলে আসাটা তাঁর পক্ষে সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল, তবে এখন তিনি নিরাপদ এবং পরিবারের সাথে আবার মিলিত হয়েছেন। ‘আপনি যদি হাসেন, বাদবাকিরাও আপনার সাথে হাসবে। আপনি যদি হাসি বন্ধ করে ফেলেন, আপনি মারা যাবেন’।

 

 

Post a comment