Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

প্রফেসর এ এল বাশামের সাক্ষাৎকার

[ভূমিকা: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক এ এল বাশাম ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসেছিলেন ইতিহাস সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন মুনতাসীর মামুন। মুনতাসীর মামুন তখন ছিলেন তরুণ সাংবাদিক। এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। এটি নেয়া হয়েছে মুনতাসীর মামুনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। পাঠকদের সুবিধার্থে গণহত্যা জাদুঘর ব্লগে পুনরায় প্রকাশিত হলো।]

প্রফেসর বাশাম এ কয়দিন ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন। এই ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সময় করে নিলেন। বললেন বিকাল চারটায় ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে যেতে যেখানে তিনি অবস্থান করছেন। ঠিক সময়ে যেয়ে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে তিনি অভ্যর্থনা জানালেন। বসে বসে বোধহয় বই পড়ছিলেন। বিছানা এলোমেলো। কম্বলের অর্ধেকটা মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আরাম কেদারায় বসে, পকেট থেকে পাইপ বের করলেন। সেটা হাতে ঠুকতে ঠুকতে মৃদু হেসে বললেন, নাউ মি. মামুন, হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু নো?

কথোপকথন আমাদের ইংরেজীতেই হয়েছিলো। কিন্তু মি. বাশাম বাংলাও জানেন। বাংলা উনি কিছুটা লিখতে পারেন এবং পড়তে পারেন। কারণ, আলোচনা শেষে উনি আমাকে বললেন, তোমাদের পত্রিকা এক কপি পাঠিও তো আমাকে। বললাম, বিচিত্রা তো বাংলায় বের হয়। উনি বললেন, তাতে কি, বাংলা আমি পড়তে পারি। তারপর প্রফেসর বাশামকে কিছু প্রশ্ন করি।

প্রশ্ন: ইতিহাস সম্মেলনে যে সব প্রবন্ধ পড়া হলো সেগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
উত্তর: সম্মেলনে যেসব প্রবন্ধ পড়া হয়েছে সেগুলো সত্যিই খুব ভালো হয়েছে। আলোচনাও বুদ্ধিদীপ্ত এবং সন্তোষজনক। কিন্তু সম্মেলনের কার্যবিবরণী সম্পূর্ণভাবে আমি বুঝতে পারিনি কারণ কিছু কিছু প্রবন্ধ বাংলায় পড়া হয়েছে।

প্রশ্ন: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কালচারাল প্যাটার্নের বিশেষ বৈশিষ্ট্য গুলো কি?
উত্তর: অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন, আমার মতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কালচারাল প্যাটার্নের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে গোষ্ঠীবদ্ধতা দৃঢ়বোধ, নিবিড় পারিবারিক সংহতি এবং স্তরবদ্ধ সমাজ গঠনের প্রবণতা। এই একই প্যাটার্ন আমাদের নজরে পড়বে পেশওয়ার থেকে চিটাগাং, কাশ্মীর থেকে শ্রীলঙ্কা অব্দি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ কিভাবে ঐ প্যাটার্নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: বাংলাদেশের লোকেরা দক্ষিণ এশীয় এবং ঐ অঞ্চলের তার বন্ধন বেশ নিবিড়। বাংলাদেশীয় ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষাভাষী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মুসলমানরা সেই একই হিন্দু সংস্কৃতির ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। এখানেও স্তরবদ্ধ সমাজ গঠনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বস্তুত বাংলাদেশের সাথে প্রপার ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার খুব মিল আছে। মুসলমান বাঙালীদের সাংস্কৃতিক প্যাটার্ন অনেকটা ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার মুসলমানদের মতো।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ-ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিহাস শিক্ষা বিশেষ করে প্রাচীন ইতিহাস শিক্ষা সম্পর্কে আপনার মতামত এবং এ শিক্ষার সমস্যাগুলো কি ও কিভাবে এসব সমস্যা দূর করা যায়?
উত্তর: এই উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাস রচনা এবং শিক্ষা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার এবং অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সংক্ষেপে বলছি। এই উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের প্রি-হিস্ট্রি এখনও জানা যায়নি। শুধু তাই না প্রাক-মৌর্য যুগ সম্পর্কেও খুব একটা ভালো ধারণা আমাদের নেই। এই উপমহাদেশে সভ্যতা এসেছিল কিভাবে? কোত্থেকে? এ কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে এসেছে না গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে। এ সমস্ত সমস্যা রয়েছে। পাহাড়পুর, ময়নামতিতে বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু এখানকার বৌদ্ধরা অন্যান্য অঞ্চল থেকে একটু আলাদা ছিল। বস্তুত এখানে এক ‘পিকুলিয়ার ফর্ম অফ বুদ্ধিজম’ নজরে পড়ে। এই সব বৌদ্ধদের অনেকে আবার পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। এদের সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু জানার আছে। এসব জানতে হবে।

প্রশ্ন: কিভাবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগে যাব? আপনি চেয়ারম্যান আমাদের সাহায্য করতে পারেন?
উত্তর: প্রত্যক্ষভাবে আমাদের পক্ষে এখন কিছু সাহায্য করা অসম্ভব। বরং আমরা একটা পরোক্ষ সম্পর্ক, সংস্কৃতি সম্পর্কে, সাংস্কৃতিক সমস্যা সম্পর্কে, একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে তুলতে পারি। অস্ট্রেলিয়ার ছাত্ররা এই উপমহাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহশীল, আমার তো মনে হয় ব্রিটিশ ছাত্র ছাত্রী থেকে অস্ট্রেলিয়ার ছাত্র ছাত্রীরা এ ব্যাপারে বেশী রেসপনসিভ। আর অস্ট্রেলিয়ায় যেয়ে পড়ার জন্য বৃত্তির বন্দোবস্তও হয়ত করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক এ.এল বাশামের সঙ্গে মুনতাসীর মামুন, ১৯৭২

প্রশ্ন: ইতিহাস লেখার মেথডলজি সম্পর্কে আপনার নিজ দৃষ্টিভঙ্গি কি?
উত্তর: ইতিহাস রচনায় মেথডলজির ব্যাপারে কোন ধরাবাঁধা নিয়ম আমি অনুসরণ করি না। ইতিহাস এক ধরণের বিজ্ঞান। সমস্ত সোর্সকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। ইতিহাস রচনার সময় অনেক তথ্যাবলী, ঘটনা আমাদের নজরে পড়বে। সেগুলি সঠিক না অতিরঞ্জিত সেইসব বিশ্লেষণ করতে হবে। হিস্ট্রিকালি এনালাইজ করতে হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে ঐ সবের প্রতি দৃষ্টি রেখেই ইতিহাস রচনা করা উচিত।

প্রশ্ন: নতুন কোন বই লেখার পরিকল্পনা কি আপনার আছে?
উত্তর: অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস কালচারাল হিস্ট্রি অব সাউথ এশিয়া নামে একটি বই প্রকাশ করবে যার সম্পাদক আমি। ঐ বইতে ত্রিশটি অধ্যায় আছে যার মধ্যে তিনটি আমার লেখা। এ ছাড়া একটা পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হবে যার নাম জেনারেল হিস্ট্রি অব সাউথ এশিয়া। কিছুদিন যাবত আত্মার পুনর্জন্ম সম্পর্কে ভারতীয় ধারণার উপর একটি বই লেখার জন্যে তথ্য সংগ্রহ করছি। এখনও লেখা শুরু করিনি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের উপর কি নতুন কোন বই লেখার পরিকল্পনা আপনার আছে?
উত্তর: না, বর্তমানে এ ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা আমার নেই। কারণ আমি এখন অত্যন্ত ব্যস্ত। প্রায়ই এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে হয়। তাছাড়া আমি ঐ রকম পণ্ডিত না যারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা বই নিয়ে পড়ে থাকে। আমার পড়ালেখা কাজকর্মের মাঝেও আমি চাই পরিবার পরিজনদের সাথে একটু গল্প করতে, গাড়ী করে একটু ঘুরে বেড়াতে, নিজের বাগানে একটু কাজ করতে। আর তাছাড়া বাংলাদেশের তোমরাই এ সম্পর্কে নতুন বই লিখবে।

একথা বলে তিনি সামনের টেবিলে পড়ে থাকা একটা বই দেখিয়ে বললেন এটা পড়েছ? বলে একটু হাসলেন। বইটি ছিল শেখ মুজিবর রহমানের বক্তৃতাবলীর একটি সংগ্রহ। আমি মাথা নাড়তেই বললেন, এতেও কিছু আছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উত্তর: দেখো, আমার মতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। অন্তত সাধারণ বাঙালীদের মতো আমি এ ব্যাপারে হতাশ নই। এখানে পা দিয়েই আমার কানে এসেছে অসম্ভব দুর্নীতির কথা, প্রাইভেট আর্মির কথা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা। তবে আমার মনে হয় এগুলি সাময়িক। আস্তে আস্তে এসব দূর হয়ে যাবে। আমার মতে এজন্যে এখন সবাইকে বিশেষ করে তরুণদের কাজ করতে হবে। বেশী করে কাজ করতে হবে। সবকিছুর উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি নরনারীকে নিজের জন্যে যথেষ্ট উৎপাদন করতে হবে। এবং নিজের জন্যে প্রত্যেকে যথেষ্ট উৎপাদন করতে পারে। এ কোন কঠিন কাজ না। ভারতে এদিক দিয়ে অনেক অসুবিধা আছে যা তোমাদের মধ্যে নেই। এতো একটা মস্ত সুযোগ। যেমন তোমাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি, ভারতে একজন কুলীন ব্রাহ্মণ রাস্তা ঝাড়– দিতে পারে না। বা একজন শিক্ষিত যুবক বাসের কনডাকটারী করতে লজ্জা পেতে পারে। যা হোক মনে হয় তোমরা মুক্ত। আমি একটি কথা বিশেষ করে বলা প্রয়োজনীয় মনে করি। বাংলাদেশে বা বাঙালীরা যেন কাউকে অনুসরণ না করে। তাদের যেন কখনও এই চিন্তা না আসে আমাদের রাশিয়ার মতো হতে হবে বা আমেরিকার বা চীনের মতো হতে হবে। বাংলাদেশকে নিজেদের ঐতিহ্য সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নিজেদের এককভাবে গড়ে তুলবে। বাঙালী বাঙালী হবে। বাংলাদেশ বাংলাদেশ হবে।

প্রশ্নোত্তর শেষ হওয়ার পর প্রফেসর বাশাম আমার অটোগ্রাফ খাতায় বাংলায় লিখলেন জয় বাংলা। এ এল বাশাম। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললেন ঢাকায় এলে নিশ্চয় আবার দেখা হবে. . . . . . .সালেমালেকুম।

Post a comment