Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

নীহারঞ্জন রায়ের সাক্ষাৎকার

[ভূমিকা: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন রায় ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসেছিলেন ইতিহাস সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন মুনতাসীর মামুন। এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। মুনতাসীর মামুন তখন ছিলেন তরুণ সাংবাদিক। এটি নেয়া হয়েছে মুনতাসীর মামুনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। পাঠকদের সুবিধার্থে গণহত্যা জাদুঘর ব্লগে পুনরায় প্রকাশিত হলো।]

গত বারোই মে থেকে চৌদ্দই মে পর্যন্ত ঢাকায় বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত তৃতীয় ইতিহাস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এ সম্মেলনে দেশী বিদেশী আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ঐতিহাসিকরা যোগ দিয়েছিলেন। যেমন ভারত থেকে এসেছিলেন ড. নীহাররঞ্জন রায়, অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রফেসর এ.এল. বাশাম, এছাড়া আরো অনেকেই এসেছিলেন এ সম্মেলনে যোগ দিতে।

ইতিহাস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঐতিহাসিকরা এলেন, এ যেমন সৌভাগ্যের কথা তেমনি বাংলাদেশ নামে ছোট্ট দেশে দু’তিনটি ইতিহাস পরিষদ বা সমিতি থাকা দুর্ভাগ্যের কথা। বর্তমানে ঐতিহাসিকদের দুটো সংগঠন আছে বাংলাদেশে এবং একটির সাথে অপরটির সম্পর্ক মোটেই আত্মীয়-সুলভ নয়। গুজব শোনা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই নাকি রাজশাহীতে আরেকটি ইতিহাস সমিতি গড়ে তোলা হবে। একই উদ্দেশ্যে একাধিক সমিতি স্থাপনের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেই আমাদের মনে হয়। কারণ কিছুদিন আগে ইতিহাস সমিতি চাটগাঁতে একটি সম্মেলন করলেন। ইতিহাস পরিষদ করলেন এ মাসে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ইতিহাস পরিষদের সভাপতি হচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক ড. এবি এম হাবিবুল্লাহ।

যাক যা বলছিলাম। তিনদিন ব্যাপী এ সম্মেলনে আলোচনা এবং প্রবন্ধ পাঠের জন্যে চারটি অধিবেশন বসে। অধিবেশনগুলিতে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর এ এল বাশাম, প্রফেসর দীনেশচন্দ্র সরকার, প্রফেসর পরমাত্মা শরণ এবং প্রফেসর আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। অধিবেশনগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ পাঠ এবং তার উপর আলোচনা করা হয়।

সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন অনেকে সত্যি কিন্তু সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন দুজন- ড. নীহাররঞ্জন রায় এবং প্রফেসর বাশাম। ড. নীহাররঞ্জন রায় এবং প্রফেসর বাশামের নাম জানে না এমন কেউ ইতিহাসে খুব কম আছে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের দুই দিকপাল এরা দুজন। বলা হয়ে থাকে ড. রায় বাঙালীর ইতিহাস এবং প্রফেসর বাশাম ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া লেখার পর আর কিছু না লিখলেও চলবে। বাঙালীর ইতিহাস প্রতিটি বাঙালীর অবশ্যই পড়া উচিত। এ বই না পড়লে বাঙালী নিজেকে জানবে না। রাজ-রাজড়ার ইতিহাস লেখা হয়নি এ বইয়ে। এ বইতে আছে শুধু মানুষের ইতিহাস। ড. রায় নিজেই বলেছেন, “আমি মানুষের প্রেম ও ভালোবাসায় বিশ্বাসী। তাই যুদ্ধ বিগ্রহ রাজ-রাজড়াকে নিয়ে আমার ইতিহাস নয়। সাধারণ মানুষই আমার ইতিহাসের উপাদান।

আপনারা বলেন আমি ইতিহাস করি, সাহিত্য করি। আসলে আমি কিছুই করি না। আমি শুধু মানুষকে স্পর্শ করি। তার জন্যে কখনো ইতিহাস কখনো সাহিত্য ও কখনো সমাজতত্ত্বের আশ্রয় নেই। আমি পেশাগত পণ্ডিত নই। সেই নবীন জীবনেই সংকল্প ছিল- ভালোবেসে জীবন্ত বাঙালীকে স্পর্শ করবো।”

প্রফেসর বাশাম বিশেষজ্ঞ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে, তার প্রমাণ- ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার উপর এ ধরনের বই খুব কম লেখা হয়েছে। দীর্ঘ দেহী, কিন্তু বয়সের ভারে একটু নুয়ে পড়া, নাবিকের মতো বিষণ্ণ নীল চোখের প্রফেসর বাশাম এখন থাকেন অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের তিনি চেয়ারম্যান। বয়স যার এখন বিলম্বিত কিন্তু শরীরে যার বিন্দুমাত্র ছাপ পড়েনি, কথা বললেন যিনি থেমে থেমে স্পষ্ট করে, মনোগ্রাহী করে, সেই ড. নীহাররঞ্জন রায় এখন ভারতের একজন জাতীয় অধ্যাপক।

বিচিত্রার তরফ থেকে আমরা ড. রায় ও প্রফেসর বাশামের সাথে একক বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।

ড. রায়কে মাত্র একটি প্রশ্ন করেছিলাম- অনেকদিন পর বাংলাদেশ এসেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে এখন আপনার কি ধারণা?
প্রশ্ন শোনার পর ড. রায় এক নাগাড়ে কথা বলে গেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যাবলীর উপর তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছেন।

বিদেশী সাহায্য
ড. রায় সিগারেট ধরিয়ে থেমে থেমে বললেন, ধারণার কথা জিগ্যেস করেছো কিন্তু কিছু ধারণা করতে পারলাম কই। সেই উনপঞ্চাশ সনের পর আর ঢাকায় আসিনি। এবার যাও আসলাম সম্মেলনে এত ব্যস্ত থাকছি যে ঘুরেফিরে কিছু দেখবো তার সময়ই নেই। কিছু একটা ধারণা করতে হলে সবকিছু ঘুরে ফিরে দেখা দরকার।

আমি বললাম, ঠিক আছে, বাংলাদেশ কি করে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে তাই বলুন।

সিগারেটের ছাই ঝেড়ে, ড. রায় বলতে লাগলেন, দেখো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কিছুদিন মাত্র কিন্তু এ শিশু রাষ্ট্রকে ভারত থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। নতুন রাষ্ট্র, যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্র, পুনর্গঠনে সে উন্মুখ। সুযোগ বুঝে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে শক্তিমানরা। কিন্তু সাহায্য দিলেই নিতে হবে? নিশ্চয় না। বিদেশী সাহায্য নেয়ার ব্যাপারে অনেক বুদ্ধি খরচ করতে হয়। ঋণ নেয়ার শর্তসমূহ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে হয়। আর শুধু ঋণ নিলেই তো চলবে না, সে ঋণ শোধ করতে হবে। এবং ঋণ নেয়ার আগে নিজেদের কর্মক্ষমতাও যাচাই করে নেয়া উচিত। নয়ত পরে এমন হবে যে সুদই হয়তো আসলের সমান হয়ে যাবে।

অর্থনীতি
বাংলাদেশ যদি সবচেয়ে প্রথমে তার অর্থনীতির দিকে নজর না দেয় তবে খুবই অসুবিধায় পড়বে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা খুব কঠিন না। কিছু দিনের মধ্যেই তা করা সম্ভব কিন্তু সবার আগে অর্থনীতির বুনিয়াদ ঠিক করা উচিত। অর্থনৈতিক কাঠামো শক্ত না হলে দেশ দাঁড়াতে পারবে না।

খাদ্য সমস্যা
তারপর আসে খাদ্য-সমস্যা। এ ব্যাপারে ভারতবর্ষে আমরা কিছু ভুল করছি যার জন্যে আমাদের খাদ্য সমস্যা এখনও দূর করতে পারিনি। দশ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন চারগুণ বাড়াতে হবে। এককথায় ‘এগ্রিকালচার ওয়েলথ’ বাড়াতে হবে। এর জন্য আধুনিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা উচিত কিন্তু ‘ওভার ম্যাকানাইজেশন’ বাংলাদেশে চলবে না। কারণ বাংলাদেশের প্রায়ই তো জলে ডোবা। হ্যাঁ, আরেক কথা শিল্পক্ষেত্রে বা কৃষিক্ষেত্রে টেকনিশিয়ান বেশী আনা থেকে টেকনিক্যাল এ্যাপারেটার্স বেশী আনা দরকার। আর সেইসব যন্ত্রপাতি চালাবার টেকনিক নিজেদের শিখে নেয়া উচিত। ভারতবর্ষে কি হয়েছে। এখানে অনেক সফিসার্টিফেটেড যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু চালাবার যে অভাব সেখানে।

নীহাররঞ্জন রায়, রাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব

পরিবার পরিকল্পনা
জনসংখ্যাই যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে খাদ্য সমস্যার সুরাহা হবে কি করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পরিবার পরিকল্পনা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। প্রতি বছর তিন-চার পারসেন্টের বেশী জনসংখ্যা বাড়তে দেয়া উচিত না। সম্ভব হলে তৃতীয় সন্তানের পর বাধ্যতামূলক পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষা সমস্যা
বাংলাদেশকে জ্ঞানের সব শাখা জানতে হয়। বাংলাদেশের জনগণকে বাস্তব জ্ঞানের ভিত্তি দেয়া দরকার কারণ স্বাধীনতার পর ইমোশনে পেট ভরে না। কিছু মনে করো না, ‘এক্সপানশান অব ইউনিভারসিটি’ এর আমি বিরোধী। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বসাবার কোন দরকার নেই। উচ্চ শিক্ষা যতদূর হয়েছে ততদূরই যথেষ্ট। সেটাকে এখন সংহত করা দরকার। বাকী টাকা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য খরচ করা উচিত। প্রায় লোককেই বেশীদিন নিরক্ষর রাখা উচিত না। ভারতবর্ষে এ ভুল আমরা করেছি, বাংলাদেশে যেন তা করা না হয়। শুধু তাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আবার নতুন করে সাজানো উচিত। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস বদলানো উচিত।

বাংলাদেশের সামরিক খাতে বেশী খরচ না করলেও চলে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্ধন মৈত্রীর। বার্মার সাথেও সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। ভারতের যেমন পাকিস্তানের মতো শত্রু আছে বাংলাদেশের তেমন কোন শত্রু নেই। সুতরাং প্রতিরক্ষায় বেশী খরচ করে লাভ কি? তবে বাংলাদেশের নজর দেয়া উচিত স্মাগলিং এর দিকে। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় বা বিলাস দ্রব্যের স্মাগলিং এর কথা বলছি না আমি বলছি আর্মস এন্ড এমুনেশন স্মাগলের কথা। বড় বড় দেশ হয়ত বাংলাদেশে নাশকতামূলক কাজের জন্যে অস্ত্র স্মাগল করতে পারে। সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা উচিত।

এরপর একটানা কথা বলার পর ড. রায় একটু থামলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন:

একটা দেশ গড়তে হলে দেশের সবকিছু জানতে হয়। দেশকেই যদি না জানবে তো দেশ গড়বে কি করে? বাংলাদেশটা পুরো ঘুরেছো? বলতে পারো বাংলাদেশের তুলা কোথায় হয়। বলতে পারো মধুপুর, চাটগাঁর পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি কেন লাল? জানো না। দেশ গড়তে হলে অর্থনীতি জানতে হবে, সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে জানতে হবে।

ভারতবর্ষে আগে বাঙালীদের আর্টিকুলেশনের পথ বন্ধ ছিল। তাদের কোন সামাজিক ক্ষমতা ছিল না। এখন শতাব্দীর পর সেই সুযোগ এসেছে। বহুদিনের এই ঘুমন্ত এনার্জিকে কাজে লাগাতে হবে। ইতিহাসে এই প্রথম সুযোগ এসেছে কিছু করার যা না করলে বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ ক্ষমা করবে না।

একটি প্রশ্ন
এরপর আমি প্রশ্ন করি সম্মেলনে পঠিত প্রবন্ধগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি? ড. রায় বললেন, সম্মেলনে অনেক প্রবন্ধ পড়া হচ্ছে। বাংলাদেশের অনেকেই প্রবন্ধ পড়েছেন। কিন্তু কোন ঐতিহাসিকই এমন কোন প্রবন্ধ লেখেননি যা ভবিষ্যৎ কিছুর উপর আলোকপাত করতে পারে। পাণ্ডিত্যের চেয়েও দরকার এখন দূরদৃষ্টির। সম্মেলনে এমন কোন প্রবন্ধও নেই যা বর্তমান কালের উপর আলোকপাত করতে পারে। এমনকি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের উপরও প্রবন্ধ নেই।

আরেকটি প্রশ্ন
আপনি বাঙালীর ইতিহাসের আদিপর্ব লিখেছেন। দ্বিতীয় পর্ব কি লিখবেন না?

উত্তরে তিনি একটু হেসে বললেন, ইউ কান্ট ফোর্স ইভেন্টস, সারকামস্টেন্স এখনও তৈরী হয়নি। তৈরী হলেই লিখব। আর লেখা শুরু করলেই বা কি হবে। বাংলাদেশের খবর এতদিন জানতাম না। আর দেখ প্রথম পর্বও বহুদিন ছাপা নেই। এখনও ছাপতে দেয়নি। কারণ ঐ বই বের হওয়ার পর এক ময়নামতি থেকেই ১১টা তাম্রশাসন পাওয়া গেছে যা আমি দেখিনি। নতুন কিছু ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। ঐসব পরীক্ষা করে, না জেনে কি লিখবো।
আমি এবার প্রশ্ন করব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা?

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। সমস্ত সম্পদ যদি কাজে লাগানো যায় তবে তো কথাই নেই, যেমন ধরো, ব্রহ্মপুত্রের অগাধ জল তোমাদের কোন কাজে আসছে না। সমস্ত গিয়ে পড়ছে সমুদ্রে অথচ ব্রহ্মপুত্র যদি বাঁধ দেয়া যায় তবে বাংলাদেশের সমস্ত গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

শেষ প্রশ্ন
বাঙালীর ইতিহাসে আপনি লিখেছেন, বাঙালীরা হলো বেতস লতার মতো। ঝড় আসলে নুয়ে পড়ে, ঝড় শেষ হলে মাথা তুলে দাঁড়ায়। আপনি কি এখনও সেই মত পোষণ করেন?

নির্বিকারভাবে ড. রায় বললেন -হ্যাঁ।

Post a comment