Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

চুকনগর গণহত্যা: নির্যাতিতদের মৌখিকভাষ্য

[ভূমিকা: ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে পাকিস্তানি বাহিনী এক নির্মম গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় ঠিক কতজন লোক মারা গিয়েছিলেন তার কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। চুকনগর গণহত্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন মুনতাসীর মামুন। তার মতে, ‘সেদিন কত লোক চুকনগরে শহীদ হয়েছিলেন? তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। তবে ওই জায়গায় যারা লাশ নদীতে ফেলেছিলেন তারা প্রায় পাঁচ হাজার পর্যন্ত লাশ গণনা করে আর গণনা করেন নি। তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী চুকনগরে দশ হাজারের বেশি মানুষ ওই দিন শহীদ হয়েছিলেন।’ আজ ২০ মে, চুকনগর গণহত্যা দিবস। এ গণহত্যার দুজন নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এখানে তুলে ধরা হলো। এটা নেয়া হয়েছে মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘চুকনগর গণহত্যা’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে। বইটি প্রকাশ করেছে গণহত্যা জাদুঘর। আমরা আজ কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেদিনের শহীদদের।]  

পূর্ণ চন্দ্র রায়

পিতা: প্রসন্ন কুমার রায়

বয়স: ৮০

পেশা কৃষি

গ্রাম: বয়ার গঙ্গা

ডাকঘর: উত্তর বয়ার গঙ্গা

থানা: বটিয়াঘাটা

২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকা আক্রমণের খবর রেডিওতে শুনে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। প্রতিদিন রেডিওতে শুনতাম। আশে-পাশে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করতাম। মানুষজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বৈশাখ মাসের দিকে জলমার হাই স্কুলে পাকবাহিনী গুলি করে দালান-কোঠা ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনার পর ডুমুরিয়া থানার রংপুর, শাহপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের বহু লোক ভারতে চলে যায়। এর ফলে আমরা আরও ভীত হয়ে পড়ি। আমিও সপরিবারে ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত নেই।

রাতের অন্ধকারে পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে বের হই। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম দিকে সেদিন ছিল মঙ্গলবার। ডুমুরিয়া থানার ঝাপলা গ্রামে রাত কাটালাম। পরদিন সকালে আবার হাঁটা শুরু করলাম। বুধবার রাতে খড়িবুনিয়ায় ছিলাম। রাতে খড়িবুনিয়ায় রান্না করে খাই। পরদিন সকালে রান্না করে কিছু খেয়ে নিলাম কারণ খাবার জুটবে তার কোনো ঠিক নেই। খড়িবুনিয়া থেকে নৌকায় করে জ্যৈষ্ঠ মাসের পাঁচ তারিখে বৃহস্পতিবার সকালে চুকনগরে এসে পৌঁছাই। লোকজনের মধ্যে একটা ভয় ভয় ভাব দেখতে পেলাম। কেউ কেউ বললো, এখানে গুলি হতে পারে। চারদিকে চাপা আতঙ্ক।

নৌকা থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ চুকনগর বাজারের বিভিন্ন দোকানপাট খোলা প্রান্তরে সাময়িক আশ্রয় নেয়। বেলা এগারোটার দিকে চুকনগরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণ থেকে গুলির আওয়াজ আসে। কেউ বলছে পাকবাহিনী, কেউ বলছে মুক্তিবাহিনী গুলি করছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কি করবো। কিন্তু গুলির শব্দ যখন ক্রমশ নিকটবর্তী হচ্ছে তখন আর ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারলাম না। আমরা নদীর ওপাড়ে যাবার জন্য তৈরী হই। বড়দা আর আমার এক খুড়তুতো ভাই বললো, “আমরা তো বুড়ো মানুষ, মারে তো যুবকদের আমাগের মারবে না।” এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকে তারা রয়ে গেলেন। আমি ছেলেমেয়ে সহ নদীর গর্তের মধ্যে লুকালাম। যদিও জানতাম  যে জ্যৈষ্ঠ মাসে লোনার সময়ে নদীতে কুমীর থাকে। প্রাণের ভয়ে আর কোনো বিকল্প চিন্তা মাথায় আসেনি। এই অবস্থায় শুনলাম নদীতে গুলি করতে করতে পাকবাহিনী এগিয়ে আসছে। বুঝলাম এখানে থাকলে গুলি খেতে হবে। তখন নৌকা নিয়ে নদীর উত্তর পাড়ে গিয়ে নামলাম। সংবাদ পেলাম ডাঙা দিয়ে আসছে গুলি করতে করতে। তখন আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যার মতো চলে যেতে লাগলাম। বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে কাঁটার উপর দিয়ে হেঁটে গেলাম। “ঈশ্বরের কি করুণা সে কাঁটা আমাদের পায়ে ফুটলো না। গায়ে লাগলো না। মানুষের নির্মম ব্যবহার তবু প্রকৃতির যে দান সে দানে আমাদের কোনো জায়গায় ব্যথা লাগলো না।” এই কাঁটার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চুকনগরের উত্তর পাশে ডেরচিতে গিয়ে স্নানটান করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। একজন এসে জানালো যে আমাদের দাদা পাকবাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন। দাদার মৃত্যু সংবাদ শুনে ঠিক করলাম যে একবার অন্তত লাশটা দেখতে যাব। “এ দৃশ্য জীবনে কোনোদিন দেখি নাই। গুলি খেয়ে রক্তের স্রোত বয়ে যায় সেই রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আর মনুষ, কেউ হাত নাইড়ছে কেউ মাথা নাইড়ছে কেউ মুখ মেইলছে। এরকম করতিছে। তা আমি তখন ঐ একেকটা লোকের উপরদে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে ঐ আমি সেইখানে যেইয়ে দেখি, আমার ঐ দাদা খুড়তুতো ভাই একজন আর আমার সহদোর দাদা উনার ঐ গুলি ঠিকই বুকে লাগছে।

যেদিকে তাকই কেবল লাশ, কত মানুষ সেদিন পাকবাহিনী হত্যা করছে, তার হিসাব দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক ঘন্টার ভেতরে অগণিত মানুষ লামে পরিণত হয়। ”আমি যখন খেয়া পার হই তখন একটা মেয়ে ছেলে (মহিলা), সে চিৎকার করে কানছে। আমি বলছি মা কানছো কেন?

তা বললো আমার স্বামীকে এরকম বুকে জড়ায়ে ধরেছিলাম। ওরা এসে আমার স্বামীকে ছাড়ায় নিয়ে স্বামীর বুকে রোল ধরে গুলি করেছে। …ছোট ছোট বাচ্ছা ঐরম মাকে মায়ের উপরে মরা মানুষের বুকের উপরে দুধ খাচ্ছে। আর মা মরে গেছে।” চুকনগর হত্যাকাণ্ডের পর আরও ৪/৫ দিন দেশে ছিলাম। টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় সবই চুকনগরে হারিয়েছি। ভিক্ষার ওপর জীবন ধারণ করেছি। এই কয়দিন আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করেছি। কারণ ভারতে চলে গেলে আবার ফিরে আসতে পারবো কিনা তা তো জানতাম না। নদীর তীরে ঘুরে বেড়াই। “চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীতে শুনতাম মৃতদেহ শ্যাওলার মতো ভেসে যাচ্ছে। আর এইখানেও দেখলাম মৃতদেহ জোয়ারে মানে জোয়ারে চলে যায়। ভাটায় নেমে আসে এবং এগুলো নদীর কিনারায় ঐ চরের উপর লেগে যায়।” লাশের গন্ধে গ্রামে বসবাস অবম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমাদের পরিবারের সবাই ভারতে চলে গেলাম।

দেশ স্বাধীন হবার পর আমাদের গ্রামের লোকজন পৌষ-মাঘ মাসে ফিরে আসে ভারত থেকে। আমি অসুস্থ ছিলাম, তাই ফাগুন মাসে আসি। চুকনগর অবিচার অত্যাচার বিচার হওয়া দরকার।’

চুকনগর স্মৃতিস্তম্ভ

মাহাম্মদ শের আলী সরদার

পিতা: আহাদ আলী সরদার

বয়স: ৬৩

পেশা: কৃষিকাজ

গ্রাম: চুকনগর

যেদিন গুলি হয় তার আগে রাতের বেলা ‘ঘুম পারা যেতো না’, জেগে থাকতে হতো। ‘আমরা রাত্রিরে বিছানায় পা-ই দিতে পারি নাই। ঐ আসছে এইখানে সব দৌড়া, কাল ঐখানে দৌড়া। কানে ধুরুম ধারাম শব্দ আসতো।’ আতঙ্ক, ভয়েতে রাত কাটাতে হতো। আতঙ্ক আতঙ্কভাবে দিন কাটিয়েছি।

ওরা (আর্মিরা) এলো জ্যৈষ্ঠ মাসের পাঁচ তারিখ, সেই বৃহস্পতিবারে বেলা ১০টা কি সাড়ে ১০টার সময় যে গুলি শুরু হয় তা বেলা তিনটা পর্যন্ত চলে। আমি বাড়ির থেকে খবর পাই, শুনি যে এই জায়গায় (চুকনগর বাজার) গুলি চলছে। ’শব্দ তো ডিকলেয়ার হয়ে গেল যে ঐখানে চারটা-পাঁচটা মরছে। পাথরখোলায় মানুষ মেরে লাশ ফেলাই রাখছে। এই খবর শুনে আমরা তো বাড়ি ছেড়ে ঘরে তালাচাবি দিয়ে একখানা গর্ত ছিল সেই গর্তের ভিতর যেয়ে বসে থাকি।

ওরা আসলো এই পশ্চিম, সাতক্ষীরার দিক থেকে। গাড়ি আসলো, গাড়ি এসে এই গ্রামটার ঐ মাথার থেকে ওরা ঐ ধার দিয়ে নেমে গেল। বাজারের রোড দিয়ে একখানা গাড়ি বাজারের ভিতরে ঢুকে গেল। ওরা তিন গাড়ি আসে। তিন গাড়ি তিনভাবে ভিতরে গেল। নদীর সাইডে ঢুকেছিলো। আর এই বাজারে এই রাস্তার ফাঁক দিয়ে ঘোরাফেরা করতো। আর দুপুরবেলা এই সাইডে পাঁচখানা গাড়ি আসে। পাঁচখানা আমরা দেখি নাই, আমরা তিনখানাই দেখেছি।

গাড়ি দেখলাম আমার বাড়ির সামনে যেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমার চাচাকে দেখা যেত হিন্দুর মত। আপনার মতন এরকম পরিষ্কার। ’আমার চাচারে দেহি তা ওনারা কইতেছে কি তোর নাম কি? কয় আমার নাম রতন আলী, রতন সরদার। রতন আবার সরদার হয়? কিরুম করি? তুই কি মুসলিম না মালাউন হ্যায়। কয় আমি মুসলিম হ্যায়। কয় নাহ, মুসলিম হয় না। তুই মালাউন হ্যায়। তো এরপর কাপড় উঁচু করতি কয়। তো বলে কাপড় উঁচু করি দেখাইতে হইবে। আমার চাচা দেখাইলো। তো সেই হরি মানে বিশ্বাস করলো। আমারে আর আমার চাচারে সাথে করে নিয়ে গেল। বলছিল যে আমাদের দেখাই যে কমনে মনে লোক আছে। কি করবো ওগির সাথে থাকতি হলো আর ওরা গুলি করতি লাগিল। উপায় তো নেই। জীবনের ভয়েতে, ওদের না দেখাইলে আমাদের গুলি করতে পারতো। এই তিনডো পর্যন্ত মাইরে, তিনডোর পর ওরা আবার টাউনে চলে গেল ডাইনের সাতক্ষীরা রোডে।’

লাশ সরাতে গিয়ে দেখি যে পিঠের দিক দিয়ে গুলি চলে গেছে। বুক কলিজা-মলিজা সব উঠে চলে গেছে। গলার কণ্ঠমালায় সব উঠে চলে গেছে। এইরম অবস্থা দেখলি মনে অসহ্য লাগে।

তা আমরা দুই ভাই দুইশ একখান লাশ করিয়েছি। এক ‘খানি’ দুইজন। দুইজন করে লোক ঐ এক পাশে একেকটা দড়ি, পেছনে দড়ি। ‘মাজা দিয়ে বাঁশ কুইড়ে দিয়ে দুইজন ঘাড়ে করে নিয়ে নদীতে (ভদ্রা নদী) ফেলে এলাম।’ দুইশ করিয়া খানি ফেরিয়ে তারপর আমার চোখ-টোখ মানে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার মতন হয়ে যায়।

‘আমরা ঘাড়ে করি লাশ ফেললাম। মাইরলো আমার পুকুর পাড়ে, তা এর বিচারডা আমার চাব না? বিচার না হলি আমরা টিকতে পারবো না। বিচার করবে কেডা? আমার নিয়ে তদন্ত করবে কেডা? বিচারডা কবো কার কাছে? আমরা সেই লোকই তো খুঁইজে পাইছি না। বিচার তো আমরা চাই। আমরা যদি বাস্তবিক করতে পারি এই বিচারটা বাপ-চাচারা তো চইলেই গেছে এখন তার (শহীদ পরিবার) মা-চাচীরা, ভাইবোন, কডা আছে তারা সুস্থ মতন যাতে থাকতি পারে, খাওয়া পড়া পায়, এই আমার দাবি।’

Post a comment