Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

খিদে

[গৌরচন্দ্রিকা: মুনতাসীর মামুন সাধারণত ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক হিসাবে বহুল পরিচিত হলেও তাঁর আরো কিছু পরিচয় আছে, যা অনেকেই জানেন না। তিনি একাধারে একজন অনুবাদক ও ছোটগল্পকার। তাঁর লেখালেখির জীবন শুরু হয়েছিল অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে। ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্য রচনাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। ‘খিদে’ নামক গল্পটি লেখা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। গল্পটি নেয়া হয়েছে মুনতাসীর মামুনের ‘কড়া নাড়ার শব্দ’ নামক গ্রন্থ থেকে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে; প্রকাশক ডানা প্রকাশনী। মুনতাসীর মামুনের সত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে গল্পটি ব্লগে উন্মুক্ত করা হলো।] 

মনে মনে নওশাদ তাকে অবরণহীন করে তুলছিলো। জিভ দিয়ে সমস্ত শরীর চাটছিলো এবং চাটতে চাটতে তাকে অনুসরণ করছিলো।

নেতার জনসভা তিনটেয়। এখন বাজে দুটো। পুরোপুরি একঘন্টা সময় আছে হাতে। এরিমধ্যে সে মেয়েটির বাসার খোঁজ নেবে। তারপর নেতার সভায় যোগ দেবে। সেখানে তাকে অবশ্যই থাকতে হবে। দরকার হলে যেন মাঠে নেমে পড়া যায়। ‘শালার অন্যান্য দলগুলির যেন দেশের জন্যে দরদ উথলে উঠছে’, মনে মনে সে খিস্তি করে এবং বিরোধী কাউকে বাগে পেলে কি করবে তারও একটা সুখকর চিত্র আঁকে।

মেয়েটি চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছিলো। সে আবার তাকে খুঁজে অনুসরণ করে। দু’একদিন ফলো করে টাইমিংটা জেনে নিতে হবে। হু… … তারপর!

যথারীতি মেয়েটির বাসার খোঁজ পাবার পর সে ফিরে এলো ময়দানে। সেখানে তখন সবেমাত্র ট্রাকে করে ভাড়া করা লোকগুলি এনে হাজির করা হয়েছে। মোটামুটি জমবে, সে ভাবে। তারপর লোকের ভীড় কেটে কেটে স্টেজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। যেতে যেতে সে ভাবে, ‘বিকেলে অবশ্যই নেতার সংগে দেখা করতে হবে’। ওনার ‘বিজিনেস’ লাইনটার দেখাশোনার ভার উনি এখন থেকে তাকে দেখতে শুনতে দিতে চাইছেন। ইদানীং সে নেতার নেকনজরে আছে। এই ফাঁকে মাসোহারাটা একটা বাড়িয়ে দিতে বলতে হবে।

ভার্সিটির ক্লাশ শেষ হওয়ার পর কবির এক মিনিটও দেরী না করে রওয়ানা দেয় বাসার দিকে। একে রোদ, তার ওপর হেঁটে হেঁটে অতদূর যাওয়া। ‘একটা মিটিং ছিল অজি রেসকোর্সে’, মনে মনে সে ভাবে, ‘মিটিংটা শুনে যাব—শালা যেয়ে কি লাভ?’ কিন্তু পরমুহূর্তে মন ঠিক করে ময়দানের দিকে রওয়ানা হয়।

মোটামুটি লোক হয়েছে। ভাড়ার লোকগুলি ট্রাক থেকে ব্যানারট্যানার আর মুখভর্তি শ্লোগান নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামে। নেতৃবৃন্দ এখনও এসে পৌঁছান নি। এই এলেন বলে।

নওশাদ অস্থির হয়ে উঠছিল মনে মনে, কখন নেতারা অসিবেন, বক্তিমে করবেন, বক্তিমে শেষ হবে, তারপর ছুটি। আর ততোক্ষণ বসে বসে রোদ গেলো, ধুলো গেলো, খিস্তি খেউর গেলো। ‘কেন শাল, টাইম মতো এলে কি হয়। তা হলেইতো আমি তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে যেতে পারি, বন্ধ বান্ধবের সঙ্গে প্ল্যানটা ঠিক করতে পারি। অমন মলি হাতছাড়া করা যায়। কখনো?’ কিন্তু তাকে অপেক্ষা করতেই হবে। মিটিং ছেড়ে গেলে নেতা ব্রুদ্ধ হবেন এবং ক্রুদ্ধ হওয়া মানে তার ঠিক আগের নওশাদে ফিরে যাওয়া। ওটাতে সে রাজী নয়। ‘এইতো বেশ আছি। চীনে খেয়ে, মেয়ে নিয়ে, ঘুরে ফিরে। কাজের মধ্যে তো খালি নেতার কথা মতো একে ওকে শায়েস্তা করে দিয়ে আসা। ও আর এমন কি কাজ। অস্তর থাকলে হাতে সব কিছুই সোজা।’

কবিরের হঠাৎ মনে হয় এখন না এলেই পারতো। নেতা কি বলছেন সকালে পড়ে নিলেই হতো। ‘সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছি। এখন আবার ঘরে ফিরে খাবো। পেটটা জ্বালা করছে। দুপুরে যে কিছু কিনে খাবো তার পয়সা কই?’

ঐ যে নেতা আসছেন। জনতা হর্ষধ্বনি করে উঠলো। নেতৃবৃন্দ স্টেজে গুছিয়ে বসলেন। তারপর বক্ততা। নেতা শুরু করলেন—‘দেশ কালোবাজারী, মুনাফাখোর, প্রভৃতিতে ছেয়ে গেছে। দুষ্কৃতিকারীদের জন্যে নিরীহ জনসাধারণের শংকাহীন জীবন-যাপন করা অসম্ভব হয়ে উঠছে। আমাদের এখন কর্তব্য ঐক্যবদ্ধভাবে ঐ সব মুনাফাখোর, কালোবাজারী এবং দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’

দুষ্কৃতিকারী কথাটা শুনে নওশাদের হঠাৎ হাসি পেলো। কে যে দুস্কৃতিকারী অরি কে যে না? ‘মানুষ চেনাই দায়’ গানের কলিটা একটু শিষ দিয়ে গায় সে এবং তারপর হঠাৎ কিছুদিন আগে রাস্তায় গুলি খাওয়া দুটি যুবকের কথা তার মনে হয়। ঐ দু’জনের একজন ছিল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধ, এবং একদিন সে তাকে বোঝাচ্ছিলো। ঐ শান্তি, ভিয়েতনাম ইত্যাদি আর কি। সে তাতে বিন্দুমাত্র উৎসাহিত হয়নি। ‘ঐ পলিটিক্স ফলিটিক্স আমাকে বুঝাসনে’ সে বলেছিলো। বলে সে তৃপ্তি পেয়েছিলো। ‘এই আছি। বেশ আছি। কিসের অভাব? নেতা আছে কেন আর পুষছেই বা আমাদের কেন? তোদের মতো শুকনো হাড়গিলে পলিটিসিয়ানদের পেটাবার জন্যেই তো।’ কিন্তু তবুও ওই যুবকের কথা মনে হওয়ায় তার মন একটু খারাপ হয়ে গেল। ‘শালী দুষ্কৃতিকারী’ বিড়বিড় করে বলে সে।

এবার আরেক নেতা বলে চলেন, ‘দেশের জন্যে আমরা কি করিনি আর কি দেইনি বলেন? সব দিয়েছি, তবুও কিছু কিছু লোক আমাদের ঐ। কষ্টার্জিত স্বাধীনতা নস্যাতের চেষ্টা করছে……।’

কবিরের হঠাৎ এমন বিরক্তি লাগলো। সে ঠিক করলো আর ঐ ছেঁদো বক্তৃতা শুনবে না। বাসার দিকে পা বাড়াতেই পেটে টান পড়লো, একটু দম নিয়ে সে চলা শুরু করলো।’ মিটিং ফিটিং দিয়ে আর কতদিন লোককে ভুলানো যাবে। শালা একবেলা রুটি খেতে হচ্ছে, কোন সময় তা’ও না। সংসার ঠিক রাখতে বাবার অবস্থা কাহিল। আগে তবুও তো ছিমছাম চলে যেতো সব। এখন দেখ, এই কয়মাসে বাবার চুল সাদা হয়ে গেছে, হাড় বেরিয়ে গেছে, আর আমি তাদের এই দামড়া ছেলে কোন কাজে আসছি না। পড়াশোনা করছি। শালা পড়াশোনা-কবে পশি করে বেরুবো তার নেই ঠিক- যাক ওসব ভাবনা। সে এখন অন্যকথা ভাবতে থাকে, বাসায় ফিরে তড়িঘড়ি করে কিছু খেয়ে ঘুমোবে। বিকেলে ঘুমিয়ে ওঠে চেহারাটা যখন একটু ফ্রেশ দেখাবে তখন সে যাবে মিলির বাসায়। আহ! অজি অনেকক্ষণ থাকবে মিলির ওখানে। ওখানে থাকলে অনেক কিছু ভোলা যায়।

এক সময় মিটিং শেষ হয়। ক্লান্ত এবং ভাড়াকরা লোকগুলি ফিরে যাবার জন্যে তৈরী হয়। নওশাদ প্যাণ্ডেলের এক কোণে বসেছিলো। বক্তৃতা শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কারণ এগুলোর প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। দিনে তিন-চার বার শুনতে হয় কিনা তাই। বক্তৃতার শেষে শ্লোগান শুনে তার ঘুম ভাঙ্গে। চটপট উঠে সে রওয়ানা হয় নেতম বাড়ী। আগে গিয়ে লাইন দিতে হবে। নয়ত রাশি রাশি লোক এক তাদের খিদের লিস্ট পার হয়ে নেতার কাছে পৌঁছতে তার রাত হয়ে যাবে।

ঘুম ভাঙ্গার পর বেশ ঝরঝরে লাগছিলো কবিরের। পাটভাঙ্গা কাপড় পড়ে এবং মিলিকে কি কি বলবে মনে মনে তার মহড়া দিতে দিতে সে মিলির বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো। কিন্তু গলির মোড় অব্দি এসে সে থমকে দাঁড়ালো। ডাস্টবিনের কাছে এক বাচ্চা মেয়ে, পরনে একটা তেনা গোছের কিছু, একটা ঠোঙ্গা চেটে কি যেন খাচ্ছে। হলুদ রস গড়িয়ে পড়ছে দু’পাশ দিয়ে, আরেক জন বোধহয় তার সঙ্গী মনোযোগের সঙ্গে ডাস্টবিন খুঁটছে। তার ভীষণ বমি পেলো। বিশেষ করে ঐ হলুদ রসের টপটপ করে গড়িয়ে পড়া দেখে ভীষণ বমি পেলো তার। বমি রুখতে রুখতে সে কোন রকমে বললো, ‘এই করছিস কি এখানে, ভাগ… …।’

মেয়েটা একটুও না ভড়কিয়ে দাঁত বের করে বললো, ‘কি করমু, খিদা পাইছে যে।’

১৯৭৩

Post a comment