Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

ইফতি, ইস্তাম্বুল আর অশ্রুত একুশ।। চৌধুরী শহীদ কাদের

  • চৌধুরী শহীদ কাদের

ইফতির সাথে আমার প্রথম পরিচয় ইস্তাম্বুলে। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র, নির্মূল কমিটির সাথে জড়িত এর বেশি কিছু জানতাম না ই্ফতি সম্পর্কে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের এক সকালে ইস্তাম্বুলের ব্লু মস্কের পাশে সুলতান আহমেত এলাকায় অবস্থিত ব্লু হাউস হোটেলের লবিতে প্রথম দেখা। আমরা (আমি, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও রয়া মুনতাসীর) চারদিন ইস্তাম্বুলে ছিলাম, ইফতি ছিল আমাদের ছায়াসঙ্গী।

আমাদেরকে পেয়ে ইফতির সেই কি উচ্ছ্বাস। তাকসিম স্কয়ার, গ্যালাতা টাওয়ার, গ্রা- বাজার থেকে ব্লু মস্ক ইফতির সাথে আমার ও রয়ার কতো আনন্দময় স্মৃতি।

বসফরাস পার হয়ে নাজিম হিকমত কালচারাল সেন্টারে শেষ বিকালের আড্ডায় মাত্র কুড়ি বছর বয়সের এক তরুণের চিন্তা, অভিজ্ঞতার কাছে নিজেকে শিশু মনে হচ্ছিল। এরপর ই্ফতির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে। ২০২০ এর বইমেলায় ইফতি ঢাকায় আসল। আমি, রয়া ও অমিত ভাই ঢাকা ক্লাবে একসাথে দীর্ঘ আড্ডা দিলাম। তুরস্কে পড়তে আগ্রহী কত ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ইফতিকে নিয়মিত বিরক্ত করে যায়।

ইস্তাম্বুলে নাজিম হিকমতে যাওয়ার পথে ইফতি, মুনতাসীর মামুন ও রয়া মুনতাসীর।

২০২০ এর বইমেলায় ইফতির সাথে শেষ দেখা। ২০২১ এর করোনাময় বইমেলায় পরিচয় হল ইফতির বই ‘অশ্রুত একুশ’ এর সাথে। অনন্যা বের করল শাকিল রেজা ইফতির আত্মকাহিনী। মাত্র এক বছরে ভীষণ বদলে গেছে আমাদের ইফতি।

অশ্রুত একুশ মনে হতে পারে একটি উপন্যাস, নায়ক ইফতির জীবন যুদ্ধের গল্প। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটি উপন্যাস নয়, আত্মজীবনী। একুশ বছরের স্বপ্নময় এক তরুণের যাপিত জীবনকে উদযাপনের বিবরণ। ভূমিকায় ইফতি লিখেছেন, ‘একুশ বছরে কেউ আত্মকাহিনী লেখে না, যদি না সে মৃত্যুর ডাক শোনে’।

যৌবনের প্রারম্ভে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ইফতি একুশ জীবনের ছোট জীবনের অশ্রুময় আখ্যান তুলে ধরেছে এই গ্রন্থে। ইস্তাম্বুলের একটি হাসপাতালের  বেডে শুয়ে, প্রচন্ড শারীরিক যন্ত্রণায় কাতর অবস্থায় মৃত্যুর শিয়রে দাঁড়িয়ে মাত্র কুড়ি বছরের অতীতকে দেখেছে আপন আয়নায়। যেখানে পাঠক হিসেবে আমরা দেখতে পায় এক যুদ্ধ জয়ের গল্প। মফস্বল শহরের এক কিশোরের বিশ্বজয় কিংবা বিপরীতে শৈশব কৈশোর চুরি হয়ে যাওয়ার অশ্রুত বিবরণ। অনেকটা রাশান উপন্যাস ইস্পাতের নায়ক পাভেলকে খুঁজে পাবে পাঠক।

তাকসিম স্কয়ারে ইফতি, আমি ও রয়া মুনতাসীর।

বইটি পড়তে গিয়ে বার বার মনে হচ্ছিল ছোট ইফতি কীভাবে পেরেছে জীবনের এতসব বন্ধুরতম পথ পাড়ি দিতে। অষ্টম শ্রেনীর একজন ছাত্র কীভাবে মেনে নিয়েছে তাঁর মার আত্মহনন কিংবা বাবার পরকীয়া। দিনাজপুরের অনাথ এক কিশোর কিভাবে নিজের চেষ্টায় ইউরোপে পড়তে গেল, দুইবার দেশ সেরা মেধাবী নির্বাচিত হল, একাধিক ভাষা শিখল এসব সমীকরণ মেলাতে অবশ্যই পাঠ্য অশ্রুত একুশ

অশ্রুত একুশ নিয়ে লিখতে গিয়ে ইফতির মেন্টর লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ২ এপ্রিল ২০২১ জনকন্ঠ লিখেন, আমি শাকিল রেজা ইফতির অশ্রুত একুশ পড়ে একাধারে মুগ্ধ এবং স্তম্ভিত হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছি ওর লেখার সাবলীলতায়, পর্যবেক্ষণের তীক্ষèতায়, প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালবাসায়।

অন্যদিকে স্তম্ভিত হয়েছি ওর সীমাহীন দুঃসাহসে-কী নির্মোহ দৃঢ়তায় মায়ের আত্মহত্যার বিবরণ দিয়েছে, সেই সঙ্গে পিতার পরকীয়া এবং এতদসংক্রান্ত যাবতীয় জটিলতা এমনকি শৈশবে যে নির্মম যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, তা-ও অকপটে ও বর্ণনা করেছে।

মেট্রো স্টেশনে ইফতি, আমি ও রয়া মুনতাসীর।

হিটলারের আত্মজীবনী Mein Kamhf এর ইংরেজি অনুবাদ বের হয় ১৯৩৯সালে । ১৯৪০ সালে জর্জ অরওয়েল নিউ ইংলিশ উইকলিতে আত্মজীবনীর একটি রিভিউ করেন। অরওয়েল লিখছেন, হিটলারের খাকি জামা পরা নবীন বয়সের ছবি দেখলে ওর প্রতি একটা দূর্বলতা তৈরি হয়। ছবিটা প্যাথেটিক। কুকুরের মত মুখ। কিন্তু ছবিটা একটা নিপীড়িত মানুষের ছবি। শৈশব থেকে নানা ধরণের বঞ্চনা, অন্যায় কীভাবে দানব হিটলারকে জন্ম দিয়েছে অরওয়েল সে বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখছেন, এজন্য যেন সারা পৃথিবীর ওপর রেগে ছিলেন হিটলার। তিনি যেন শহীদ, প্রমিথিউসের মতো।

ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে ইফতিসহ আমরা।

ইফতির শৈশবও চুরি হয়ে গিয়েছিল। বেড়ে উঠেছিল প্রতিবন্ধকতা, ভালোবাসাহীন এক অন্ধকার নিয়ে। কিন্তু সেই অন্ধকারে থেকে আলোর পথ বেঁচে নিয়েছিল সে। লিখেছেন আত্মজীবনীতে, ‘বাইরের বিষাক্ত জগৎ থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য ডুবে গিয়েছি বইয়ের জগতে। মাকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার গানের পৃথিবী, ছবি আকার রঙিন আকাশ- সব কিছু হারিয়ে আমি বইকে সঙ্গী করেছি।’

ইফতির জন্য আজ কাঁদছে সবাই। প্রিয় ইফতি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা তুমি আরো অনেকদিন আলো ছড়াও। আমাদের এই নষ্ট সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন।

  •  লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জগন্নাাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও  সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী

Post a comment